Logo

সারাদেশ

চরফ্যাসন হাসপাতালে দালালদের দাপট, রোগীরা অসহায়

Icon

চরফ্যাসন (ভোলা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৫, ১৩:০৪

চরফ্যাসন হাসপাতালে দালালদের দাপট, রোগীরা অসহায়

ভোলার চরফ্যাসনে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একাধিক দালাল চক্র। এসব দালাল চক্র সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সহজ সরল মানুষকে ভালো চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ক্লিনিকে নিয়ে সর্বস্ব লুট করে নিচ্ছে। চিকিৎসার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সরকারি হাসপাতাল সড়ক থেকে রোগীর শয্যা পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দালালদের কয়েকটি চক্র। বাড়তি আয়ের সুযোগে জেলার তরুণ-তরুণীরা জড়িয়ে পড়ছেন এই পেশায়। চিকিৎসার আশায় গ্রাম থেকে হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের টানাহেঁচড়া করে এসব দালালরা। ছাড়াও এসব দালালরা রোগী ভাগানোর পাশাপাশি সুযোগ বুঝে হাতিয়ে নেন ওষুধ, মোবাইল, টাকা সহ জিনিসপত্র। চিকিৎসক থেকে ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক মালিক এবং ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় হাসপাতাল এলাকায় রোগী ধরতে সদা ব্যস্ত থাকে শতাধিক দালাল। ফলে দালালদের দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছেন রোগী ও স্বজনরা।  

জানা যায়, সরকারি হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় উপজেলার বিভিন্ন বাজারে গড়ে উঠা বৈধ-অবৈধ ৩৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট ক্লিনিক রয়েছে। এগুলোতে রোগী নেওয়ার জন্য কমিশনের বিনিময়ে এসব দালাল পুষছেন ডায়াগনস্টিক মালিক পক্ষ ও চিকিৎসকরা। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখার কারণে তাদের সহকারী হিসেবে নিয়োজিত ওই দালাল চক্র সড়কে দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের ভাগিয়ে নিতে তৎপর থাকেন।

ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী ও সরকারি হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসকদের ছত্রছায়ায় এসব দালাল চক্রের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছেন রোগীরা। এসব দালাল চক্র সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ফলে নিত্য দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ছেন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। এসব দালালের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবিকারা জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।  

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরফ্যাসন সদরসহ উপজেলার সর্বত্র ছড়িয়ে গড়ে উঠেছে ৩৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ১৪টি প্রাইভেট ক্লিনিক। যেগুলোর মধ্যে ৭টির অনুমোদন থাকলেও বাকি ৩১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে কোনোটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে না। এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোর মধ্যে ৫টি প্রত্যন্ত হাটবাজারে এবং ৩৪টি উপজেলা সদরের হাসপাতাল সড়কে গড়ে উঠেছে। ১০০ শয্যার সরকারি হাসপাতালের ২০০ গজের মধ্যে এবং হাসপাতাল সড়কের দু’পাশজুড়ে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় সরকারি হাসপাতালগামী রোগীরা প্রায়ই গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই দালালদের বহুমুখী টানাটানির মধ্যে পড়ে। টানাটানি শেষে কোনো রোগী সরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছলে সেখানে উৎপেতে থাকেন ঝাঁকে ঝাঁকে দালাল।  

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের বিভ্রান্ত করে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে ভাগিয়ে নিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, গ্রামের সহজ সরল রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসার নামে সঠিকভাবে প্যাথলজি পরীক্ষা না করেই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। প্রত্যেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে অনেক চিকিৎসক ও দালালরা এসব প্যাথলজি থেকে কমিশন পেয়ে থাকেন। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে উঠা এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোর বেশিরভাগই নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মনীতি ও দক্ষ লোকবল এবং উন্নত মানের যন্ত্রপাতি। আবেদন করেই আধা-পাকা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনসহ যন্ত্রপাতি থাকলেও অদক্ষ কিছু টেকনেশিয়ান দ্বারা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ভুল ও ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা। এছাড়া রয়েছে পরীক্ষার রিপোর্টের ভিন্নতা। এছাড়া ১৪টি প্রাইভেট ক্লিনিকের মধ্যে মাত্র ৫টি ক্লিনিক ১০ শয্যার অনুমোদিত লোকবল নিয়ে সঠিকভাবে পরিচালিত হলেও অপর প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তুলেছেন ২০-৩০ শয্যার প্রাইভেট ক্লিনিক। 

লিজা বেগম নামের এক প্রসূতি নারী জানান, সম্প্রতি সময়ে তিনি চরফ্যাসন হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গেলে মাঝপথেই পড়েন দালালদের খপ্পরে এবং তাকে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সিটি হার্ট হাসপাতালে। সেখানে তার রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করতে গেলে রিপোর্ট আসে বি- পজিটিভ। বিষয়টি তার সন্দেহ হলে তিনি ওই পরীক্ষাটি পার্শ্ববর্তী এসটিএস ক্লিনিকে পরীক্ষা করান, সেখানে রিপোর্ট আসে ও-পজিটিভ। দুই ক্লিনিকের রক্তের গ্রুপের ভিন্নতা দেখে তিনি ফের মেঘনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান। সেখানে তার রক্তের গ্রুপ নির্ণয় আসে ও-পজিটিভ। রক্তের গ্রুপের ভিন্নতার কারণে তার সিজারিয়ান অপারেশনে বিঘ্ন ঘটে।

সচেতন মহল জানান, এই ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি নেই। তারপরও তারা ক্লিনিক ও প্যাথলজি ল্যাব চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব ক্লিনিকে ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অনিয়ম হলেও নেই কোনো তৎপরতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক জানান, কিছু চিকিৎসক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের ছায়াতলে থেকে অপকর্ম করছেন এসব দালালরা। রক্ষক যখন নিজেরাই ভক্ষক হয়, তখন আর করার কিছুই থাকে না। রোগীদের অহেতুক পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়ে ডায়াগনস্টিক মালিকপক্ষ থেকে সামান্য কিছু সুবিধা নেওয়ার জন্য কিছু চিকিৎসক এসব অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। 

চরফ্যাসন হাসপাতালের টিএইচও ডা. শোভন বসাক দালাল চক্রে দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করে দাবি করেন, হাসপাতাল চত্বরে দালালদের উৎপাত ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। হাসপাতাল চত্বর থেকে দালাল নির্মূলের চেষ্টা চলছে। 

চরফ্যাসন হাসপাতালের ভেতরে দালালদের অবস্থান। দাঁড়ানো মহিলারা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল। এদের কারণে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে রোগীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসনা শারমিন মিথি জানান, সরকারি হাসপাতাল চত্বর থেকে দালাল নির্মূল করার জন্য খুব শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাগজপত্র যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  

এম ফাহিম/এমএইচএস

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর