Logo

সারাদেশ

রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ নির্মাণে টঙ্গীবাড়ীর টিনের ঘরের চাহিদা বেড়েছে

Icon

মো. নাজমুল ইসলাম পিন্টু, টঙ্গীবাড়ী (মুন্সীগঞ্জ)

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২১:৩৭

রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ নির্মাণে টঙ্গীবাড়ীর টিনের ঘরের চাহিদা বেড়েছে

ছবি : বাংলাদেশের খবর

নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহজে সরিয়ে নেওয়া যায়, এমন কাঠ-টিনের ঘরের প্রচলন মুন্সীগঞ্জের পদ্মাপাড়ে দীর্ঘদিন ধরেই। কয়েক বছর আগেও ‘রেডিমেড’ এসব ঘর শুধু স্থানীয়ভাবে বিক্রি হতো, তবে নান্দনিক সৌন্দর্যের কারণে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। দৃষ্টিনন্দন রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ তৈরির জন্যও এসব ঘর কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ক্রেতারা।

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বেতকা, পাইকপাড়া, আজিমপুরা, বেতকা, রান্ধুনীবাড়ি, বেশনাল এলাকায় নকশা খচিত দোচালা, তিন চালা, চার চালা, সাত চালা নতুন ঘরগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

উপজেলার বেশনাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নান্দনিক এসব ঘর তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ। যন্ত্র ও হাতের সাহায্যে কাঠের নকশা ফুটিয়ে তুলছেন শ্রমিকেরা। তাঁদের হাতুরি পেটা ঠুকঠাক শব্দে মুখর পুরো এলাকা। ঘুরে দেখা যায়- কয়েকটি এক চালা, দুই চালা টিনের ঘর দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের দরজা, জানালা, বেড়া, টুয়া, চাল, ভেতরে-বাহিরে সব কিছুতেই নকশা করা কারুকাজ। ঘরগুলো দেখলেই আটকে যায় চোখ। দৃষ্টিনন্দন এসব ঘর তৈরি হয়েছে কাঠ, টিন, প্লেন শিট দিয়ে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাইজেরিয়ান কাঠ দিয়ে বেশিরভাগ ঘরগুলো তৈরি করা হয়। এ ছাড়া সেগুন, শাল, বাচালু ও ওকান কাঠের ঘরের চাহিদাও রয়েছে। এসব ঘরে বেড়া ও চালের জন্য ৩০, ৩২, ৪৮ মিলিমিটার টিন ব্যবহার করা হয়। কখনো বেড়ার নকশার কাজে টিনসেড ব্যবহার করা হয়। একেকটি ঘর নির্মাণ করতে ৫ থেকে ১০ জন শ্রমিকের সময় লাগে ৪ থেকে ৫ দিন। টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা ঘরগুলোয় পর্যাপ্ত আলো–বাতাস পাওয়া যায়।

বিক্রেতারা বলছেন, মানসিক প্রশান্তি আর নান্দনিক নকশার কারণে মুন্সীগঞ্জসহ শরীয়তপুর, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, রংপুর, ঢাকা, গাজীপুর, বরিশাল, নোয়াখালী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতারা এই ঘর কিনতে আসছেন। ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী দোচালা, আটচালা, ষোলচালার একতলা, দোতলা, তিনতলা টিনের ঘর বানানো হচ্ছে। সর্বনিম্ন ২ লাখ টাকা থেকে শুরু করে একেকটি ঘর আকার ও নকশা অনুযায়ী ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

এই ‘রেডিমেড’ ঘরগুলো যাঁরা কিনতে চান, তাঁরা ঘর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দুই ধরনের চুক্তি করতে পারেন। বিক্রেতারা তাঁদের নিজস্ব খরচে ঘরগুলো খুলে নিয়ে পৌঁছে দিয়ে ক্রেতাদের দেখানো জায়গায় বসিয়ে দেন। আবার ক্রেতারা কিনে নেওয়ার পর নিজের খরচেও বসিয়ে নিতে পারেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো প্রয়োজনে সহজেই ঘরগুলোর প্রতিটি জোড়া খুলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা যায়। অবস্থাপন্ন ঘরের মানুষ বিশেষ ধরনের টিন দিয়ে বাড়ির ওপর দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ করে থাকেন।

আজিমপুরার ব্যবসায়ী শামীম জানান, সাত চালা আই-আঠাশ টপ বারিন্দা (সাড়ে ২৮ বর্গ হাত) একটি ঘর যা জাপানি ‘অরিজিনাল প্লেন শিট’ ও এক আইচ লোহা কাঠ দিয়ে তৈরি ঘর চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকায় বিক্রি হয়। তবে দুই লাখ টাকায়ও খুব সুন্দর নকশা করা ঘর পাওয়া যাবে। আর পনের লাখ টাকায় ঘর বানাতে চাইলে আগে অর্ডার দিতে হবে। সেই ঘর সাইজে বড় হবে। পুরোটা হবে সূক্ষ্ম নকশা করা লোহা কাঠের। ঘরের ভেতর থাকবে কেবিন।

পাইকপাড়া ও হাতিমারা কাঠের ঘর ব্যবসায়ী রাসেল জানান, করোনার পর থেকে আমাদের দুর্বিষহ জীবনযাপন চলছে। ১৫-২০ জন মিস্ত্রির পরিবর্তে ৪-৫ জন রেখেছি। ঘর বিক্রি হচ্ছে না। কর্মচারীদের বেতন, জায়গা ভাড়া, সংসার চালানো এখন দুরূহ হয়ে পড়েছে।

১৭ বছরের বেশি সময় ধরে ঘর তৈরির কাজ করা মিস্ত্রী সুধাংশু মণ্ডল, রাজন চন্দ্র মণ্ডল, সঞ্জিত মণ্ডল জানান, ২৩ বন্দের (মানে সাড়ে ৮ হাত বাই ১৫ হাত) একটি নকশা করা ঘর তৈরিতে ৯০ দিন সময় লাগে। সাধারণত তিনজন মিস্ত্রী মিলে এক মাসে একটি ঘর তৈরি করতে পারে। নকশা ও কাঠ ভেদে একটি ঘর দুই থেকে চার লাখ টাকায় বিক্রি হয়। তবে আমরা মিস্ত্রিরা প্রতিদিন ছয়শ টাকা মজুরি ও সঙ্গে খাবার পাই। কেউ নিজে টিন, কাঠ কিনে বাড়িতে ঘর তৈরি করতে চাইলে আমরা মজুরি নিই ৩৫-৪০ হাজার টাকা।

বেতকার ঘর ব্যবসায়ী মো. জলিল বলেন, আগের মতো আর ব্যবসা হয় না। অনেক পুঁজি লাগে। কাঠ, টিন কিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু, সেই হারে ঘরের দাম বাড়েনি। গত তিন মাসে দুটি ঘর বিক্রি করেছি।

আজিমপুরার ঘরের হাটের ব্যবসায়ী শামীম হোসেন জানান, আমরা চট্টগ্রাম থেকে কাঠ নিয়ে আসি। বাচালু, নাইজিরা, শাল, সেগুন, ওকান ও লোহা কাঠ দিয়ে ঘর বানানো হয়। বছরে প্রায় ২০-২২টি ঘর বিক্রি হয়।

এআরএস

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর