যশোর জেনারেল হাসপাতাল : জনবল-বাজেট সংকটেও সেবা পেলেন ৮ লাখের বেশি রোগী
শহিদ জয়, যশোর
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:২৮
ছবি : বাংলাদেশের খবর
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ২০২৫ সালে আট লাখ ১১ হাজার ৯৩৮ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই হাজার ৯৭১ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
ওষুধ সংকট, চিকিৎসক ও কর্মীদের অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বহির্বিভাগের বৈকালিক সেবা বন্ধ থাকার মতো একের পর এক অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেও জেলা ও আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য এই সরকারি হাসপাতালটি চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে রয়ে গেছে।
চলতি বছরে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল কর্তব্যরত চিকিৎসকদের অবহেলা এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা। একাধিকবার চিকিৎসক না থাকা কিংবা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
গত ২ ডিসেম্বর শ্বাসকষ্ট নিয়ে করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি হওয়া শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান (৭০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের আসবাবপত্র ভাঙচুর এবং কর্তব্যরত চিকিৎসকের ওপর হামলা চালান।
এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি দুপুরে পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া নজরুল ইসলামের চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা। নিহত নজরুল ইসলাম শহরের বারান্দীপাড়া বউবাজার এলাকার মৃত বাবু মিয়ার ছেলে। এ ঘটনার জেরে মৃতের ছেলে ইমরান হোসেনসহ স্বজনরা দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক ইফতে খায়রুল আলম শুভর ওপর হামলা চালান।
বছরজুড়ে হাসপাতালটিতে সরকারি ওষুধের তীব্র সংকট ছিল। হাজার হাজার রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল থেকে সরকারি ওষুধ ও সরঞ্জাম চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
১ জুলাই হাসপাতালের মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মী কার্টনভর্তি ওষুধ এক কর্মকর্তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়েন। পরে মুচলেকা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া ২৬ অক্টোবর হাসপাতালের তৃতীয় তলার মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের সামনে আইয়ুব হোসেন (৪৫) নামে এক স্বেচ্ছাসেবককে সরকারি ওষুধ চুরির অভিযোগে আটক করা হয়। তিনি ঝিকরগাছা উপজেলার মাগুরা অমৃতবাজার গ্রামের মৃত বজলুর রহমানের ছেলে।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে হাসপাতাল এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ধার হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ও চাকু, যা হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে মোট সেবা নিয়েছেন: ৮,১১,৯৩৮ জন, ইনডোর রোগী: ৯৯,১৬৪ জন, জরুরি বিভাগ: ১৯,১৯৩ জন, বহির্বিভাগ: ৭,১২,৭৭৪ জন। এ সময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন মোট ২,৯৭১ জন। এর মধ্যে নারী ১,১৯৫ জন, পুরুষ ১,৬০১ জন ও শিশু ১৭৫ জন।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর হাসপাতালের পরিশোধসাপেক্ষ বৈকালিক বিশেষজ্ঞ সেবা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্বল্প খরচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
যশোর ঘোপ সেন্ট্রাল রোড এলাকার মাহফুজুর রহমান, আক্তার হোসেন, মিরাজ আহমেদসহ একাধিক সচেতন নাগরিক বলেন, হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার, ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত এবং চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো গেলে বিপুল সংখ্যক রোগীকে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, জনবল সংকট ও সীমিত বাজেটের মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ওষুধ সংকট ও অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এআরএস

