সেবা বঞ্চিত ২০ লক্ষ মানুষ
জনবল সংকটে ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল
এম.এমরান পাটোয়ারী, ফেনী
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১১
জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ২৫০ শয্যা ফেনী জেলা সদর হাসপাতালটি ঢাকা—চট্টগ্রাম হাইওয়ে সংযোগ ও ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে ফেনী জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের রামগড—মীরসরাই, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ—সেনবাগ উপজেলার হাজার হাজার দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যম আয়ের সাধারণ রোগীরা প্রতিনিয়ত এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে এ সকল রোগীদেরকে চিকিৎসা সেবা প্রদানে কর্তৃপক্ষকে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একধিক সূত্রে জানাগেছে, এ হাসপাতাল
থেকে প্রতি দিন বহির্বিভাগে গড়ে প্রায় ১২০০ জন, অভ্যান্তরীণ বিভাগে ভর্তি থাকা ৬০০—৭০০ জন, জরুরী
বিভাগে প্রায় ৫০০—৬০০ জন রোগী ছাড়াও অন্যান্য বিভাগে প্রায়
হাজারেরও অধীক রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে,
এ হাসপাতালটিতে ২১ জন কনসালটেন্ট এর পদ থাকলেও বিভিন্ন বিষয়ে কনসালটেন্ট আছেন ১২ জন,
মেডিকেল অফিসারের পদ আছে ৪২টি, সে ক্ষেত্রে এখানে কর্মরত আছেন ২১ জন। সিস্টার পদ আছে
২০০ টি কিন্তু এখানে কর্মরত আছেন ১৩৩ জন। তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির পদ আছে ১৪৭ টি আর
কর্মরত আছেন ৫৩ জন।
এ ছাড়াও বিশেষ করে মেডিসিন, শিশু রেডিওলজি
ও সার্জারির মত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চরম অভাব রয়েছে বছরের পর বছর।
পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে হাসপাতালের আইসিইউ, কিডনি ডায়ালাইসিস সেবাগুলো পূর্ণাঙ্গ
ভাবে চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও টেকনিসিয়ানের অভাবে স্যানিটেশন
ব্যাবস্থা এবং এক্স—রে বা ইসিজির মতো প্যাথোলোজিক্যাল সেবা
গুলোও চরম ভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
জানিয়েছেন ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ফেনী জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলার শত শত রোগী
প্রতিদিন এ হাসপাতালে সেবা নিতে আসেন। ফেনী জেলার উপরদিয়ে ঢাকা—চট্টগ্রাম মহাসড়কের
অবস্থান থাকায় এ মহা সড়কে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও গুরুতর আহতরা দ্রুত চিকিৎসা
নিতে এ হাসপাতালে ভর্তি হয়।
সুনাগরিক ফোরাম ফেনীর প্রধান সমন্বয়কারী
মোর্শেদ হোসেন জানিয়েছেন, ভৌগোলিক কারণে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল একটি গুরুত্বপূর্ণ
হাসপাতাল। এ হাসপাতালে ফেনী ও তার আশপাশের নোয়াখালীর সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ কুমিল্লার
চৌদ্দগ্রাম, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফটিকছড়ি, খাগড়াছডড়ির রামগড় অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসার
জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালের উপর নির্ভর করতে হয়। প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের পর্যন্ত
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত চিকিৎসক প্রয়োজন দুর্ভাগ্যের বিষয় এই হাসপাতালে
পর্যপ্ত চিকিৎসকতো নেই তার উপর যে পোস্ট গুলো রয়েছে তা শূন্য পড়ে আছে দীর্ঘদিন থেকে।
আমরা ফেনীর মানুষ আশা রাখি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ
ফেনী জেনারেল হাসপাতালে শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। সে সাথে
নতুন পদ সৃষ্টি করে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করারও আহবান জানান তিনি।
সুজন ফেনী জেলার কোষাধ্যক্ষ খোরশেদ আলম
বাবলু জানান, একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ফেনীবাসির দীর্ঘদিনের দাবি। বিএনপির
নির্বাচনী জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন ফেনীবাসীর স্বাস্থ্য
সেবার কথা চিন্তা করে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু বিগত সময়গুলোতে
কোন সরকারই মেডিকেল কলেজ স্থাপনে আগ্রহ দেখায়নি। ফেনীবাসি অনেক দিন থেকে পর্যাপ্ত
চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। সদর হাসপাতালে চিকিৎসক স্বল্পতা এবং জনবলের অভাবে
ক্রিটিক্যাল রোগী গুলোকে ঢাকা- চট্টগ্রামে রেফার করতে হয়। শূন্য পদগুলো পুরণ করে এবং
নতুন পদ সৃষ্টি করে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার উন্নতির
জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহলের প্রতি তিনি আহবান জানান।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক
ডাঃ মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, আমরা ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার জনবল ও লজিষ্টক
সাপোর্টের জন্য উদ্ধতন কতৃপক্ষের নিকট আবেদন করেছি। তারপরও আমাদের যে জনবল বা সক্ষমতা
রয়েছে তা দিয়ে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আগত রোগীদের সাধ্যমত সেবা নিশ্চিত করণে
চেষ্টা করে যাচ্ছি।
এদিকে ২৫০ শয্যা ফেনী জেলারেল হাসপাতালে
মার্চ মাসের সেবার বিবরণে দেখা যায় বহিঃবিভাগ এর রোগীর সংখ্যা ১১,৭৭৭, অন্তঃবিভাগে
ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫,৭৫০, জরুরী বিভাগ এর রোগীর সংখ্যা ৮,৭২৩, মেজর অপারেশন সংখ্যা
১৪৭, মাইনর অপারেশন সংখ্যা ১,৫৫৬, নরমাল ডেলিভারী (প্রসব) সংখ্যা ৫০১, সিজারিয়ান ডেলিভারী
সংখ্যা ৮৭, ডি.এন.সি সেবা প্রদান সংখ্যা ২১, এক্সরে বিভাগের রোগী সংখ্যা ৪৫৮, আল্ট্রাসনোগ্রাফী
১৯৭, ইসিজি ৫৬২, ইকো ২০, ইটিটি ৪, প্যাথলজি টেস্টের সংখ্যা ৪,১১৬, বিশেষায়িত হিমো—ডায়ালাইসিস সেবা
৫১৪, স্ক্যানো সেবা ৩১, আইসিইউ সেবা ৭২, এইচডিইউ (হাই ডিপেন্ডন্সি ইউনিট) ১৬৫, ভিকটিম
(ধর্ষণ) পরীক্ষার সংখ্যা (সেবা—নারী—৩, শিশু—২) ৮, ময়না তদন্ত
(পোষ্ট মর্টেম) সেবা সংখ্যা ১৪, জখমী সনদ প্রদান (ইনজুরী সার্টিফিকেট আবেদন—৩০) ২৫, বেড অকুপেন্সী
রেইট ১৫৫.০৯%, সর্প দংশন (ভেনোমাস—১, নন—ভেনোমাস—৯১) ৯২।
এ ছাড়া ২৫০ শয্যা ফেনী জেনারেল হাসপাতালে
চলমান রয়েছে ১০ বেডের ডায়ালাইসিস ইউনিট, ৬ বেডের স্ক্যানো ইউনিট, ১০ বেডে আইসিইউ ইউনিট,
২০ বেডের এইচডিইউ ইউনিট। যা ফেনীর ২০ লক্ষ মানুষের জন্য অপ্রতুল। এই ইউনিট গুলোতে বেডের
সংখ্যা বাড়ানো অতি প্রয়োজন বলে জানান তত্ত্বাবধায়ক।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

