দিনাজপুরে টমেটোর বাম্পার ফলনেও পরিবহন বিপাকে ব্যবসায়ীরা
দিনাজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১৭
চারদিকে লালাভ টমেটোর সমারোহ। কৃষক ও পাইকারদের হাঁকডাকে মুখর এখন গাবুড়া বাজার এলাকা। দিনাজপুর সদর উপজেলার এই গ্রামীণ জনপদ এখন উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য বিপণন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে মাঠজুড়ে বাম্পার ফলন আর কৃষকের মুখে হাসি থাকলেও, নেপথ্যে এক গভীর সংকটের ছায়া দানা বাঁধছে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট আর আকাশচুম্বী পরিবহন ভাড়ায় পিঠ ঠেকছে ব্যবসায়ীদের।
দিনাজপুর-চিরিরবন্দর সড়কের মাস্তান বাজার পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা এখন অস্থায়ী আড়তে সয়লাব। ভ্যান, মোটরসাইকেল এমনকি কাঁধে করে কৃষকেরা তাদের কষ্টের ফসল নিয়ে আসছেন বাজারে। টমেটোর আকার আর রঙ দেখে চলছে দরদাম। এই বাজারে শুধু স্থানীয় নয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজির হচ্ছেন কয়েক শ’ পাইকার। প্রতিটি আড়তে ১০ থেকে ৩০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বাছাই করা থেকে শুরু করে ক্যারেটবন্দি করা সব মিলিয়ে এলাকাটি এখন এক জীবন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার ফলন ও দাম দুটোই কৃষকদের অনুকূলে। সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল হামিদ জানান, গত বছরের তুলনায় এবার লাভ ভালো। প্রতি মণ টমেটো তিনি ১ হাজার ৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বর্তমান বাজারে ‘বিপুল প্লাস’ ও ‘বিউটি’ জাতের টমেটো ১ হাজার টাকা এবং ‘আনসাল’ জাতের টমেটো ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।বিকে
তবে কৃষকের এই হাসির উল্টো পিঠে রয়েছে ব্যবসায়ীদের হাহাকার। শরীয়তপুর থেকে আসা পাইকার আমিনুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, আমরা এখান থেকে বেশি দামে পণ্য কিনছি, কিন্তু ঢাকায় গিয়ে সেই দামে বিক্রি করতে পারছি না। তার ওপর জ্বালানি তেলের সংকটে ট্রাক পাওয়াই দুষ্কর। যে দু-একটি পাওয়া যাচ্ছে, তাদের ভাড়া আকাশচুম্বী। লোকসান দিয়ে আমাদের ব্যবসা চালাতে হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, দিনাজপুরের টমেটো অর্থনীতি এক বিশাল সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে। গত অর্থবছরে ৮৬৫ হেক্টর জমিতে ৩৬ হাজার ১৮ মেট্রিক টন টমেটো উৎপাদিত হলেও এবার চাষাবাদ হয়েছে ১ হাজার ১০৮ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার ১৩৭ মেট্রিক টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান জানান, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শের ফলে চাষের পরিধি বেড়েছে। ইতোমধ্যে ৯০০ হেক্টর জমির ফসল তোলা শেষ হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ফলন ভালো হলেও বাজারজাতকরণ ও পরিবহনের স্থিতিশীলতা জরুরি।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সার্থকতা এখন ঝুলে আছে পরিবহন খাতের ওপর। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকট দূর না হলে এবং পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে উত্তরের এই সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হবে। মাঠের বাম্পার ফলন তখন কেবল হাহাকারই বয়ে আনবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার যদি দ্রুত পরিবহন খাতের এই অস্থিরতা নিরসন না করে, তবে কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানের এই সেতুবন্ধনটি ভেঙে পড়তে পারে। দিনশেষে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পরিবহন ব্যবস্থার স্থবিরতা কাটানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিকে/মান্নান

