বগুড়ার যমুনা নদীর দূর্গম চরাঞ্চলের পাকা শুকনা মরিচ মানে সোনার ফসল। লাল শুকনা মরিচের খ্যাতি দেশ জুড়ে। বর্তমানে কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। যমুনা এবং বাঙালি নদী বিধৌত এ উপজেলার বেলে পদাআঁশ মাটি মরিচ উৎপাদনের জন্য উৎকৃষ্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি বছরই বাড়ছে মরিচের আবাদ। তবে কৃষক বলছে চাষ এবং ফলন বেশি হওয়ায় এবার মরিচের দামও বেশী। তাইতো মরিচ চাষে তারা লাভবান হচ্ছে।
যমুনা নদী বেষ্টিত জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার চরাঞ্চল। এ ধু-ধু চর এলাকাগুলোয় রবি মৌসুমে বাম্পার ফলন হওয়া পাকা মরিচের রঙে লালে লাল। এর বাইরে গাবতলী উপজেলায়ও আশানুরূপ আবাদ হয়েছে মরিচের। ইতোমধ্যে গাছ থেকে মরিচ তোলার কাজ শেষ হয়েছে। কোথাও সবুজখেতে লাল মরিচের সমাহার। কৃষকের বাড়ির চালা থেকে উঠান, সবখানেই এখন চলছে মরিচ শুকানোর কাজ। এ কাজে শত শত নারী শ্রমিক ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবার কেউবা শুকনো মরিচ বিক্রি করতে চরের বালিপথে হেঁটে যাচ্ছেন হাটে। কেউবা আবার ঘোড়ার গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছেন। মরিচ নিয়ে বিশাল কমর্যঞ্জ চলছে এ অঞ্চলগুলোতে। শুধু কর্মযজ্ঞই নয়, হাট-বাজারে লেগেছে বিক্রির ধুম। প্রতি বছরের মতো এ বছরও বগুড়ার সিংহভাগ মরিচ উৎপাদন হয়েছে এ চরাঞ্চলে। এ বছর প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার শুকনা মরিচ বিক্রি হবে বলে আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
জেলার মধ্যে মরিচ নিয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে যমুনাবিধৌত চরাঞ্চলের উপজেলাগুলোয়। পাশাপাশি ১০-১২টি কোম্পানি মরিচ কিনছে এখান থেকে। গত সাত দিনে শুকনা মরিচের দাম বেড়েছে প্রতি মণে তিন হাজার টাকা। মরিচের এ দামে কৃষকরা মহাখুশি। তবে কয়েকটি কোম্পানির প্রতিনিধিরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর মরিচের দাম অনেক বেশি।
বগুড়ার যমুনা নদীর পলি পড়া চরে মরিচ চাষে ভাগ্য বদলেছে কৃষকের। সারিয়াকান্দি, গাবতলী, ধুনট এবং সোনাতলা উপজেলায় এবার সাত হাজার ১০০ একর জমিতে মরিচ চাষ করা হয়েছে, যা থেকে পাওয়া গেছে ১৮ হাজার ১৭৬ টন মরিচ। মৌসুমে শুকনা মরিচ মানভেদে পাইকারি বিক্রি ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা দরে। এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়।
সারিয়াকান্দি উপজেলার চরে গিয়ে দেখা গেছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, গ্রোয়েন, বাড়ির উঠান এবং চালা মরিচে লাল হয়ে গেছে। বর্ষার আগে মরিচ শুকাতে না পারলে রঙ নষ্ট হয়ে যাবে। পাকা মরিচ শুকিয়ে বস্তা বা মাটির বড় বড় পাত্রে এমনভাবে রাখা হয়, যেন মরিচের গায়ে বাতাস না লাগে। তবে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষে শুকনা মরিচ সংগ্রহের জন্য স্থায়ীভাবে আড়ত তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মচির রাখলে বাতাস না লাগে। সেখানে ২০০-৩০০ টাকা মজুরি প্রতিদিন হিসেবে শত শত নারী শ্রমিক কাজ করছেন।
সারিযাকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল হালিম এর কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা মরিচ চাষে খরচ পড়ে ২০ হাজার টাকা। হাইব্রিড মরিচের বীজের দাম প্রতি কেজি ৭০ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি এবার মরিচের ফলন (শুকনা আকারের) হয়েছে ৮-৯ মণ। প্রতি মণ মরিচ বিক্রি হচ্ছে আট থেকে বার হাজার টাকায়। এতে কৃষকের বিঘা প্রতি লাভ থাকে ৪০ হাজার টাকা। তবে মরিচের মান যত ভালো হবে, দাম তত বেশি হবে। সে হিসাবে এ বছর প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার শুকনা মরিচ বিক্রি হবে বলে আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
আড়ৎদার রফিকুল ইসলাম জানান, গত বুধবার লাল টোপা মরিচ ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকা, শুকনা মরিচ মানভেদে ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা মণ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেরর সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন বলেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এ বছর মরিচ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। রবি মৌসুমের মরিচের পর এখন বর্ষাকালীন খরিপ-২ মরিচের জন্য প্রস্তুতি নেবেন কৃষকেরা।
অতিরিক্ত উপ-পরিচালক এনামুল হক জানান, রবি মৌসুমের মরিচের সিংহভাগ উৎপাদন হয়ে থাকে সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনার চরে। এর বাইরে আলাদাভাবে কাঁচামরিচ চাষ হয়। দেশের নামকরা স্কয়ার, প্রাণ, বিডি ফুডসসহ অনেক ফুড প্রোসেসিং কোম্পানি মরিচ কেনার জন্য ভিড় করছে। তারা নিবন্ধিত কৃষকদের মানসম্পন্ন মরিচ উৎপাদনের জন্য সামগ্রিক সহায়তা দিয়ে থাকে। মসলা প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো চরাঞ্চলে মরিচ বাছাই ও শুকিয়ে সেগুলো মেশিনে গুঁড়া করে প্যাকেটজাত করে বাজারে বিপণন করে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সোহেল মো. শামছুদ্দিন ফিরোজ জানান, এবার জেলায় মরিচের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৯শ হেক্টর। ইতিমধ্যে আমরার ৫ হাজার ৫৫০ হেক্টর অর্জন করেছি। গত বছরের তুলনায় এবার ফলন বেশী, সবচেয়ে বড় কথা হলো, কৃষকেরা এবার দাম বেশী পাচ্ছে। তবে শুধুমাত্র সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনার চরে ১৭০ কোটি টাকার বেশি শুকনা মরিচ কেনাবেচা হবে। সবমিলিয়ে এ বছর প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার শুকনা মরিচ বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিকে/মান্নান

