Logo

অর্থনীতি

শেয়ারবাজার

দুর্বল হচ্ছে কোম্পানি, লাভ কমছে বিনিয়োগকারীর

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:২৬

দুর্বল হচ্ছে কোম্পানি, লাভ কমছে বিনিয়োগকারীর

ছবি: সংগৃহীত

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো ধিরে ধিরে আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়ছে। অধিকাংশ কোম্পানি বছরের পর বছর ভালো মুনাফা তুলতে পারছে না। এতে বিনিয়োগকারীদের লাভের অংশেও ভাটা পড়েছে। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি দুর্বল পারফরম্যান্স করায় বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত লভ্যাংশের হারও ছিলো নামমাত্র। তাছাড়া, কোম্পানিগুলোর দুর্বলতায় বহু বছর ধরে নিম্নমুখী আচরণ করা শেয়ারবাজারে আরো বেশি নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাজার ছেড়ে যাচ্ছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের শেয়ারবাজারে ব্যাংক, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) ও বিমা খাত বাদে উৎপাদন ও সেবা খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি রয়েছে ২২৮টি। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৫৮টি তাদের সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। যার অধিকাংশই ১০ শতাংশের কম হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। যেখানে ব্যাংকে আমানত রাখলে নিরাপদে ১০ শতাংশ বা তার বেশি রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে শেয়ারেবাজারের অধিকাংশ কোম্পানিতে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেও মিলছে রিটার্ন। এই খারাপ পার্ফামেন্সের কারণে শেয়ারবাজারে আরো বেশি তলানিতে নেমে যাচ্ছে।

সর্বশেষ অর্থবছরে ৫৫টি কোম্পানি আগের বছরের তুলনায় লভ্যাংশ কমিয়েছে। বিপরীতে লভ্যাংশের হার বাড়িয়েছে ৪১টি কোম্পানি। আর ৬২টি কোম্পানি আগের বছরের হারে লভ্যাংশ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যে ১৫৮টি কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, সেগুলোর মধ্যে ৩৩টি নামমাত্র লভ্যাংশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার হার ৫ শতাংশেরও কম। আর ৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ১০ শতাংশে কম লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৫টি কোম্পানি। ২৪টি কোম্পানির পর্ষদ ঠিক ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ৪৯টি কোম্পানি ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে চাইছে। তবে ৪৭টি কোম্পানি কোনো লভ্যাংশ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, লভ্যাংশ একটি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির মানসিকতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিক্রি কমে যাওয়া ও দুর্বল মুনাফার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই কম লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।

ইউসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাশেদুল হাসান বলেন, লভ্যাংশের মাধ্যমে বোঝা যায় একটি কোম্পানি সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে লাভ ভাগ করতে কতটা আগ্রহী এবং তাদের নগদ প্রবাহ কতটা শক্তিশালী।

তিনি বলেন, সব কোম্পানির কাছ থেকে প্রতি বছর উচ্চ লভ্যাংশ প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে বেশি মুনাফা অর্জনের সুযোগ পায়, তাহলে তাদের জন্য মুনাফা ধরে রাখা যৌক্তিক। তবে অনেক কোম্পানি ভালো মুনাফা করলেও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে তা ভাগ করতে চায় না—যা সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক নয়।

রাশেদুল হাসানের মতে, সাধারণত ভালো কর্পোরেট গভর্ন্যান্স অনুসরণকারী এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিয়মিত ভালো লভ্যাংশ দেয়, যদিও বাজারের অনেক কোম্পানিই মুনাফা থাকা সত্ত্বেও তা করে না।

কেন কোম্পানির মুনাফা কমছে: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির চাপও কোম্পানিগুলোর মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিক্রি কমেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের লাভজনকতা কমে গেছে।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়েও খুব বেশি আশাবাদী নন বাজার বিশ্লেষকেরা। চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে নিকট ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন তারা। তবে কিছু কোম্পানির দুর্বল পারফরম্যান্সের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনাগত অদক্ষতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, প্রতিযোগিতা হারানো এবং উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী।

শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী মনির বাংলাদেশের খবরকে বলেন, অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তাদের পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারে না। বিশেষ করে উদ্যোক্তারা যখন ধীরে ধীরে তাদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যান, তখন কোম্পানির কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, সাধারণত কোম্পানিগুলো তাদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সের সময় বাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে উদ্যোক্তারা শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যান। এ কারণে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ইস্যু ব্যবস্থাপকদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তালিকভুক্ত হওয়ার পর কোম্পানির দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী দেখা যায় জানিয়ে এই বিশ্লেষক মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের আইপিওতে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির মৌলভিত্তি ভালোভাবে যাচাই করা উচিত।

কোম্পানির দুর্বলতায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব: তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর দুর্বল পারফরম্যান্স শেয়ারবাজারকে বিনিয়োগকারীদের কাছে কম আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে বাজারে বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণও কমেছে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) হিসাবের সংখ্যা ৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬৭ হাজারে।

ব্যতিক্রমী ভালো পারফরম্যান্স: সামগ্রিক দুর্বলতার মধ্যেও কিছু কোম্পানি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে এবং উচ্চ লভ্যাংশ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৫টি কোম্পানি ৫০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ২০০ শতাংশ, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ১৮০ শতাংশ, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি ১৭৫ শতাংশ, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ১৬০ শতাংশ এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি তাদের বিনিয়োগকারীদের ১২০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। 

এছাড়া, ইস্টার্ন কেবলস লিমিটেড ও ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স লিমিটেড ৮০ শতাংশ হারে, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ৬৫ শতাংশ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি পিএলসি ৬৪ শতাংশ, রেনাটা পিএলসি ও রানার অটোমোবাইলস পিএলসি ৫৫ শতাংশ হারে, মবিল যমুনা লুব্রিকেন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড ৫২ শতাংশ এবং কোহিনূর কেমিক্যাল কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বিএসআরএম লিমিটেড ও বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড ৫০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

সুশাসন থাকলে ভালো লভ্যাংশ সম্ভব: বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী কর্পোরেট সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেল থাকলে কোম্পানিগুলো ভালো লভ্যাংশ দিতে পারে। তবে অধিকাংশ কোম্পানির ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় সামগ্রিকভাবে লভ্যাংশের চিত্র হতাশাজনক।

তারা মনে করছেন, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন