যুদ্ধবিরতির খবরে কমছে তেলের দাম, শেয়ার বাজারেও স্বস্তি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:১৮
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে এসেছে। একইসঙ্গে শেয়ারবাজারেও ফিরেছে চাঙ্গাভাব।
আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৯৪ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি কমে ৯৫ দশমিক ৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অবশ্য গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় তেলের দাম এখনও বেশি। সে সময় প্রতি ব্যারেল তেল বিক্রি হচ্ছিল প্রায় ৭০ ডলারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পাল্টায় ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। ফলে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।
মঙ্গলবার সমঝোতার খবরে বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান শেয়ার বাজারগুলোতে সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়।
জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক পাঁচ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক প্রায় ছয় শতাংশ বেড়েছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং দুই দশমিক আট শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক দুই দশমিক সাত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের ফিউচার্সগুলোও ওয়াল স্ট্রিট চাঙ্গাভাবে খোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফিউচার্স চুক্তি হল ভবিষ্যতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত দামে কোনো পণ্য কেনার চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রে এসব ফিউচার্স বাজার খোলার আগেই বাজারের সম্ভাব্য গতিপথের ইঙ্গিত দিতে পারে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আলফাসেন্সের হাভিয়ের স্মিথ বলেন, সংঘাত আরো বাড়ালে জ্বালানির দাম যে ‘আকাশছোঁয়া’ হয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক ছিলেন বলেই মনে হচ্ছে।
তার মতে, পরিস্থিতি সেরকম হলে এমন একটি অর্থনৈতিক অভিঘাত তৈরি হতে পারত, যা কেউ নিতে চাইবে না, বিশেষ করে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যখন চাপের মধ্যে রয়েছে।
এমএসটি মার্কির সল কাভনিক বলছেন, হরমুজ প্রণাণির কাছে বহু তেলের ট্যাংকার আটকে আছে। যুদ্ধবিরতির সময় সেগুলো চলাচল শুরু করলে আগামী সপ্তাহগুলোতে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে।
যুদ্ধের মধ্যে কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করলেও সংখ্যায় তা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।
গত কয়েক সপ্তাহে ভারত, মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্সের মত এশিয়ার কয়েকটি দেশ তাদের জাহাজ নিরাপদে চলাচলের নিশ্চিয়তার জন্য ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
চীনও স্বীকার করেছে, যুদ্ধ শুরুর পর তাদের কয়েকটি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে।
এদিকে, ফরাসি কোম্পানি সিএমএ সিজিএম-এর মালিকানাধীন একটি কনটেইনার জাহাজ ওই নৌপথ অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে বিএফএম টিভি।
প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী একটি জাপানি জাহাজও প্রণালি পার হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে শিপিং জায়ান্ট এমওএল।
কাভনিক বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, স্থায়ী শান্তি চুক্তির বিষয়ে আস্থা না আসা পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি উৎপাদন পুরোপুরি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, ওই অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাব দিতে ইরান তেল সমৃদ্ধ এই অঞ্চলের জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে ইরান।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্টাড এনার্জির হিসাবে, সেই ক্ষতি সারাতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে এবং খরচ হতে পারে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সে হামলা হওয়ার পর মার্চের মাঝামাঝি জ্বালানির দাম লাফিয়ে বেড়েছিল।
ওই কমপ্লেক্সের মালিকরা বলছেন, হামলার কারণে কাতারের রপ্তানি সক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে গেছে। আর ক্ষতি যা হয়েছে, তা সারাতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এশিয়ার দেশগুলোতে বেশি পড়েছে।
উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার ও কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
ফিলিপাইনের তেলের চাহিদার ৯৮ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। পেট্রোলের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় গত ২৪ মার্চ প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দেশটি।
জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার কারণে এ অঞ্চলের অনেক বিমান সংস্থা ভাড়া বাড়িয়েছে এবং ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে।
জাপানের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিক্সের ইচিরো কুতানি বলেন, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সংঘাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ অনেকেরই নিজস্ব শোধনাগার বা পর্যাপ্ত তেল মজুদ নেই।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

