‘ফুয়েল পাসের’ নিবন্ধন শুরু আরও ১৯ জেলায়
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চাপে অর্থনীতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১৫
ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে দেশের অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়েছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ে পড়তে শুরু করেছে।
একদিকে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নাজুক অবস্থায় থাকা সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বাড়ছে, অন্যদিকে ভর্তুকির বোঝা কমাতে সরকারের এই পদক্ষেপকে অর্থনীতিবিদরা প্রয়োজনীয় হলেও কঠিন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
একই সময়ে বাজারে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা আরও ১৯ জেলায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যা জ্বালানি বিতরণে নিয়ন্ত্রণ জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর মধ্যেই সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিলের প্রথম ২০ দিনে দেশে ১২টি তেলবাহী জাহাজ এসেছে এবং মজুত বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের অভিঘাত এখন অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে আছড়ে পড়ছে।
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা থেকে দেশীয় ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা যে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে, এই সিদ্ধান্তটি সেই চরম সত্যকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধকালীন’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববাজার এরই মধ্যে এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের জন্য সহনশীল পর্যায়ে রাখতে বাংলাদেশ এতদিন ধরে আমদানি দামের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করে আসছিল। তিনি বলেন, জ্বালানি তেল কিনতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। দাম সামান্য বাড়িয়ে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, সেটিও তিনি উল্লেখ করেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই দাম সমন্বয় মূলত ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ এবং সরকারের সীমিত নীতিগত বিকল্পেরই প্রতিফলন।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দেবে। একই সঙ্গে পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়ের বোঝা বাড়িয়ে দেবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও সরকারের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। তার মতে, ভর্তুকির কারণে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের অপচয় হচ্ছিল, অন্যদিকে এর সুফল সাধারণ মানুষের চেয়ে সচ্ছল শ্রেণীই বেশি ভোগ করছিল।
তিনি বলেন, দাম সমন্বয় করা না হলে ভর্তুকির অর্থ জোগাতে সরকারকে হয় কর বাড়াতে হতো, না হয় ঋণ নিতে হতো অথবা অন্যান্য খাতের বরাদ্দ কমিয়ে দিতে হতো- যার প্রতিটিই সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনত।
জাহিদ হোসেন যুক্তি দেখান, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করার ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যে লোকসানের মুখে পড়ে, তার চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ওপরই বর্তায়।
তিনি বলেন, কৃত্রিমভাবে দাম কম রাখলে প্রায়ই বাজারে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ সারি এবং কালোবাজারি বেড়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দামের বড় পার্থক্যের কারণে চোরাচালানকে উৎসাহিত করা হয়; এর ফলে বাংলাদেশের ভর্তুকি দেওয়া জ্বালানির সুবিধা ভোগ করে ভিনদেশের মানুষ।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশি থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয়ে দেরি করলে তা ভবিষ্যতে আরও বেশি ভোগান্তি তৈরি করবে এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপকে দীর্ঘস্থায়ী করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক এবং এটি আরও আগেই কার্যকর করা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে ভর্তুকির বিশাল বোঝা বিবেচনায় নিলে এই নেতিবাচক প্রভাব এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তকে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মাসের মাঝামাঝি সময়ে দাম বাড়ানো হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, প্রতি মাসে দাম সমন্বয়ের নিজস্ব নিয়ম লঙ্ঘন করে সরকার তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু বেসরকারি সরবরাহকারীর মজুতদারির বিষয়টি এখন স্পষ্ট। কারণ দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বেড়েছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম প্রশ্ন তোলেন, দেশে উৎপাদিত পেট্রোল ও অকটেনের দাম কেন আমদানিকৃত জ্বালানির দামের সমান রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বিপিসি দীর্ঘদিন ধরে কোনো জবাবদিহি ছাড়াই নানা কারসাজি চালিয়ে আসছে। অব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকার নিজেই এখন ফাঁদে পড়েছে, আর বিতরণকারী কোম্পানিগুলো এই সুযোগে অতি-মুনাফা লুটছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান কৃষি খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন, বিশেষ করে চলমান বোরো মৌসুমে যখন সেচের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। তিনি জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে সেচ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সংকট ও দীর্ঘ লাইনের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ানো সেচ থেকে শুরু করে ফসল কাটা, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণÑ অর্থাৎ কৃষিপণ্যের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে খরচ বাড়িয়ে দেবে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, উৎপাদন কমে গেলে পুনরায় চাল আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া গ্যাস সংকটে সারের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, এখন ফসলের বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, কিন্তু জ্বালানি সংকটে মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে। এর ওপর কেরোসিনের দাম বাড়ায় গ্রামীণ পরিবারগুলোর ওপর চাপের বোঝা আরও ভারী হবে।
পরিবহন মালিক সমিতিগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা মহানগরে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ৪ টাকা এবং দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৮০ পয়সা করার প্রস্তাব দিতে পারে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে মহানগর এলাকায় যাতায়াত ভাড়া সর্বোচ্চ ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) লঞ্চের ভাড়া ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবে সর্বনিম্ন ভাড়াও বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
‘ফুয়েল পাসের’ নিবন্ধন শুরু আরও ১৯ জেলায়: দেশজুড়ে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর অংশ হিসেবে আরও ১৯ জেলায় নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করার কথা জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গতকাল মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়।
নতুন তালিকায় আছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম।
মন্ত্রণালয়ের পোস্টে বলা হয়, দেশব্যাপী ফুয়েল পাস সিস্টেম বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সোমবার থেকে এসব জেলায় নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় ফুয়েল পাস নিবন্ধন চালু করা হবে।
এপ্রিলের ২০ দিনে দেশে এসেছে তেলবাহী ১২ জাহাজ: ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি কাটেনি। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে ধারাবাহিকভাবে তেলবাহী জাহাজ আসছে দেশে। এপ্রিল মাসের ২০ দিনে এখন পর্যন্ত ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেল নিয়ে ১২টি জাহাজ এসেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, এ মাসে আটটি জাহাজে এসেছে দুই লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল। অকটেন এসেছে দুটি জাহাজে ৫৩ হাজার টন। একটি করে জাহাজে এসেছে প্রায় ১২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল।
এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরো ১২ হাজার টন ডিজেল। এই সরবরাহের কারণে রবিবার থেকে অনেক ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, কয়েক দিনের মধ্যে চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, নিয়মিত তেল আসছে। এপ্রিলে সংকট নেই। অকটেনের মজুত ইতোমধ্যে মাসিক চাহিদার চেয়ে বেশি হয়েছে। এখন মে ও জুনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ‘এ মাসে তেলের সংকট নেই। পর্যাপ্ত তেল আমদানি হয়েছে। আরো জাহাজ আসছে।’
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

