শেষ কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে সূচকের সামান্য উত্থান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২৯
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের শেয়ারবাজারে এক ধরনের অস্থিরতা ও মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরপতন হলেও বড় মূলধনী কিছু কোম্পানির ওপর ভর করে সূচকের সামান্য উত্থান বা অপরিবর্তিত অবস্থায় দিন শেষ করেছে বাজার। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে লেনদেনের পরিমাণ। আগের দিনের তুলনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন কমেছে প্রায় ১৭২ কোটি টাকা। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিক্রয় আদেশের চাপে এবং নতুন করে ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে বাজারে এই ঝিমিয়ে পড়া ভাব দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ডিএসইতে লেনদেন
শুরু হয়েছিল একরাশ ইতিবাচক প্রত্যাশা নিয়ে। লেনদেনের প্রথম ২০-৩০ মিনিট অধিকাংশ শেয়ারের
দাম বাড়তে থাকায় প্রধান সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু এই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। বেলা বাড়ার
সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ মুনাফা তুলে নেওয়ার লক্ষে শেয়ার বিক্রির আদেশ
বাড়াতে থাকেন। ফলে বেলা ১১টার মধ্যেই সিংহভাগ শেয়ারের দাম কমে যায় এবং সূচক ঋণাত্মক
হয়ে পড়ে। দিনের শেষ ভাগে এসে নির্দিষ্ট কিছু বড় মূলধনী এবং ‘ডিএস-৩০’ সূচকের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানির
শেয়ারে ক্রেতার আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচক বড় পতনের হাত থেকে রক্ষা পায়। ডিএসইতে দিনশেষে
লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৯৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ১৩৮টির, বিপরীতে দাম কমেছে
১৯৯টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর।
অধিকাংশ শেয়ারের দাম কমলেও ডিএসইর প্রধান
মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় মাত্র ০.০০৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫,২৯৯ পয়েন্টে অবস্থান
করছে। মূলত বাছাই করা ৩০টি শক্তিশালী কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচকের ১০ পয়েন্ট
উত্থানই প্রধান সূচককে টেনে ধরে রেখেছে। দিনশেষে ডিএসই-৩০ সূচক অবস্থান করছে ২,০১৫
পয়েন্টে। এছাড়া শরিয়াহ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস ১ পয়েন্ট বেড়ে ১,০৬৭ পয়েন্টে
অবস্থান করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন ছোট ও মাঝারি মূলধনের
শেয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ‘ব্লু-চিপ’ বা মৌলভিত্তি
সম্পন্ন শেয়ারে বিনিয়োগ ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এর ফলে সাধারণ শেয়ারের দর কমলেও সূচক
বড় কোনো ধাক্কা খায়নি।
বৃহস্পতিবার ডিএসইতে মোট ৮৮৪ কোটি ৬২ লাখ
টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। অথচ আগের কার্যদিবসে অর্থাৎ বুধবার লেনদেনের পরিমাণ
ছিল ১,০৫৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা ছিল গত দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেই হিসেবে একদিনের
ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন কমেছে ১৭১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
শেয়ারের শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা
যায়- এ-ক্যাটাগরিতে ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ভালো মানের কোম্পানিগুলোর মধ্যে
৮০টির দাম বেড়েছে, বিপরীতে ৯৭টির দাম কমেছে, বি-ক্যাটাগরিতে মাঝারি মানের কোম্পানিগুলোর
মধ্যে দর বেড়েছে ২৪টির এবং কমেছে ৪৭টির, জেড-ক্যাটাগরিতে লভ্যাংশ না দেওয়া বা দুর্বল
মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর চিত্র ছিল করুণ; ৩৪টির দাম বাড়লেও কমেছে ৫৫টির আর মিউচুয়াল
ফান্ডে ৩টি ফান্ডের দর বাড়লেও ১৩টির দাম কমেছে।
বৃহস্পতিবার লেনদেনের লড়াইয়ে শীর্ষে ছিল
সিটি ব্যাংক। এদিন ব্যাংকটির ৪০ কোটি ৬৮ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে
থাকা লাভেলো আইসক্রিমের লেনদেন হয়েছে ২৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার শেয়ার। এছাড়া শীর্ষ তালিকার
অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং (২৭.৪৬ কোটি টাকা), এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ,
একমি পেস্টিসাইড, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, অগ্নি সিস্টেম এবং খান ব্রাদার্স পিপি
ওভেন ব্যাগ।
রাজধানীর বাজারের মতো চট্টগ্রামের বাজারেও
ছিল মিশ্র হাওয়া। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৪,৮৩২ পয়েন্টে
দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৪টির দাম বেড়েছে এবং
১০৩টির দাম কমেছে। তবে ডিএসইর বিপরীতে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। আজ সিএসইতে
২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিন ছিল ১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
বাজার পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা মনে করেন,
সূচক ৫,৩০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমার আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। যদি লেনদেনের পরিমাণ
পুনরায় ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে না যায়, তবে বাজার বড় কোনো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাতে
পারবে না। বিশেষ করে আসন্ন বাজেটের আগে কর সংক্রান্ত কোনো নীতি পরিবর্তন হবে কি না,
তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি কাজ করছে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় না হলে এবং নীতিগত বড় কোনো সাপোর্ট না থাকলে ছোট
বিনিয়োগকারীদের পক্ষে বাজারকে টেনে তোলা কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, সপ্তাহের
শেষ দিনে শেয়ারবাজার বিনিয়োগকারীদের খুব একটা সুখবর দিতে পারেনি। সামনের দিনগুলোতে
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে বাজার স্থিতিশীল
করার প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

