Logo

অর্থনীতি

আল-আরাফাহ ব্যাংক

লুটপাটকারীদের মালিকানায় ফেরার ইঙ্গিত

Icon

এম এস হাসান

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৩৪

লুটপাটকারীদের মালিকানায় ফেরার ইঙ্গিত

ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এক সময় চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই; বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিচালকদের কেউই ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার নন, ফলে মালিকানায় তাদের কোনো অংশও নেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংকটির আগের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যকে অপসারণ করা হয় এবং তাদের শেয়ার মালিকানাও শূন্য ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটি শেয়ারধারী পরিচালকদের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে।

তবে হঠাৎ করে ব্যাংকটির মালিকানা পরিবর্তনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যার প্রতিফলন মিলছে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির বড় অঙ্কের শেয়ার বাজারের ব্লক মার্কেটে লেনদেন হতে দেখা গেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব লেনদেন ভবিষ্যতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি শেয়ার কিনে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলেও আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, এর পেছনে চট্টগ্রামভিত্তিক ওই বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীর বড় ভূমিকা থাকতে পারে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি মাসের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেটে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের অন্তত সাড়ে আট কোটি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ব্যাংকের মোট ১১৫ কোটি ১৬ লাখ শেয়ারের মধ্যে ওই লেনদেন প্রায় আট শতাংশ। মাত্র চার মাসেরও কম সময়ে যে বিপুল পরিমাণ শেয়ার হাতবদল হয়েছে; তা নিয়ে কমপক্ষে চারজন শেয়ারধারী পরিচালক নির্বাচিত হওয়া সম্ভব।

এছাড়া ব্যাংকটির লেনদেন হওয়া শেয়ারের ধরনও এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। বেশির ভাগ দিনে এক বা দুই কিংবা সর্বোচ্চ চারজন বিনিয়োগকারীর বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের মাধ্যমে এসব শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাংকটির পরবর্তী পরিচালনা পর্ষদে জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে বড় আকারে এই শেয়ার লেনদেন হচ্ছে।

শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেট হলো মূল বাজারের বাইরে বড় অংকের বা সংখ্যায় শেয়ার কেনা-বেচার একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা পূর্বনির্ধারিত দরে লেনদেন সম্পন্ন করেন। এখানে একবারে সর্বনিম্ন পাঁচ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। ব্যক্তি বড় বিনিয়োগকারী কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা গোপনীয়তা ও বাজারমূল্যে বড় প্রভাব না ফেলে শেয়ার স্থানান্তর করতে এই প্লাটফর্মকে বাছাই করে থাকেন।

ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু চলতি এপ্রিল মাসের ১৯ দিনেই শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেটে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের প্রায় তিন কোটি ১০ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের মাস মার্চে ব্লকে লেনদেন হয়েছিলো দুই কোটি ৯৫ লাখ শেয়ার। তারও আগের দুই মাসে আরো দুই কোটির বেশি শেয়ার ব্লকে লেনদেন হয়েছে। সে হিসাবে আগের তিন মাসের তুলনায় এপ্রিলে ব্যাংকটির ব্লক লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। ধারাবাহিক ব্লক মার্কেটে লেনদেন বাড়ায় আগামী দিনগুলোতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে-এমনটাই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

সাধারণ কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনতে ব্লক মার্কেটে বড় পরিমাণ লেনদেন হতে দেখা যায়। যেহেতু বর্তমানে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে শেয়ারধারী পরিচালক নেই, সেহেতু ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক হতে এই বড় পরিমাণ ব্লক লেনদেন হতে পারে। তবে, যারা এক সময় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে থেকে বিতর্কিত হয়েছেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে অর্থপাচার করেছেন; তারা যদি ব্লক লেনদেনের মাধ্যমে পর্ষদে পুনর্বহাল হতে চান, সেটি ব্যাংকের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এতে আমানতকারীদের অর্থও ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বড় শেয়ারধারী উদ্যোক্তাদের জিম্মি করে তাদের শেয়ার হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা আমরা দেখেছি। ভবিষ্যতে তেমন কিছু যেন না ঘটে সে জন্য নিয়ন্ত্রকদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। তবে আমার ধারণা, সেই সুযোগ তারা পুনরায় পাবেন না।

এই বিশ্লেষক আরো বলেন, কেউ যদি এখন ব্লক মার্কেট থেকে শেয়ার কিনে বোর্ডে আসেনও, তবে আগের মতো লুটপাট করার সুযোগটা আর পাবেন না। যারা নতুন বোর্ডে আসবেন তারা যদি আগের মতো আবারো লুটপাটের সুযোগ পান তাহলে ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরাও ঝুঁকিতে পড়ে যাবেন। বারবার সরকারের পক্ষে থেকে এত সহয়তা দেওয়ারও সুযোগ পাবে না। তাই, নিয়ন্ত্রকদের আরো কঠোরভাবে বিষয়গুলো দেখা উচিত।

মালিকানা বাড়াচ্ছেন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী: ব্যাংকের ডিএসই প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, ব্লক মার্কেটে লেনদেন হওয়া শেয়ারগুলো শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধারণ বিনিয়োগকারীদের থেকে কিনে নেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তি বড় বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এই শেয়ারগুলো কিনছেন। শুধু মার্চ মাসেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ধারণকৃত শেয়ার ২৬ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ০২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার মালিকানা মার্চ মাসে দুই শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে ওই সময়ে ক্ষুদ্র সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা দুই শতাংশ কমে ৫৬ দশমিক ৮৩ শতাংশে নেমেছে। তা ছাড়া কয়েকজন বড় ব্যক্তি বিনিয়োগকারীও সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের থেকে অল্প অল্প করে শেয়ার কিনে নিচ্ছেন বলে ডিএসইর লেনদেন চিত্রে উঠে এসেছে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারধারী পরিচালক হতে হলে ওই কোম্পানির ন্যূনতম দুই শতাংশ শেয়ারের মালিকানা থাকতে হয়। কোম্পানি বা ব্যাংকের উদ্যোক্তা হওয়া সত্ত্বেও যদি কারো কাছে দুই শতাংশের কম শেয়ার মালিকানা থাকে তিনি পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হবেন।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির ব্লক মার্কেটের এই বড় অংকের শেয়ার লেনদেন পরিচালক হতে দুই শতাংশ শেয়ার ধারণের শর্ত পূরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শেয়ার ধারণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের মোট ৩১ জন উদ্যোক্তা ও পরিচালকের কাছে ৪৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ শেয়ার মালিকানা ছিলো। ওইসময় চেয়ারম্যানসহ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ছিলো ১৭ সদস্যের। পরবর্তীতে ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকটিতে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজন চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। পাশাপাশি বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পরিচালদের কাছে থাকা শেয়ারগুলোও জব্দ করা হয়। তবে, ব্যাংকের ১৩ জন উদ্যোক্তার হাতে থাকা ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা বহাল থাকে, যা এখনো পর্যন্ত ব্যাংকটিতে বিদ্যমান রয়েছে।

বিতর্কিত গ্রুপের হাতে মালিকানা ফেরার গুঞ্জন কেন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণিত ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অর্ডিনেন্স’ সম্প্রতি সংশোধিত হয়ে বিল আকারে জাতীয় সংবদের পাস হয়েছে। এতে নতুন করে ১৮(ক) ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। যে ধারায় পুনর্গঠনাধীন সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর ওপর সাবেক মালিকদের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে। এরপর থেকেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে যে চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ পূর্বে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলো আবারো দখল নিতে পারে।

এমন আলোচনার মধ্যেই গত ১৯ এপ্রিল রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে শোডাউন কর্মসূচি পালন করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়টি ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। শোডাউনের বিষয়বস্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিতে পুনর্বহাল হলেও তারা পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে এস আলম গ্রুপের হাতে মালিকানা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। অর্থাৎ তাদের আন্দোলনে যে পেছনে থেকে বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীটি ইন্ধন দিয়েছে, সেটি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়।

অবশ্য ওইদিনই ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয়ক পরিষদের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সমাবেশে দাবি করা হয়, চাকরিচ্যুতদের ব্যানারে যারা শোডাউন করেছেন, তারা মূলত চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠীটির ভাড়াটিয়া লোকজন। তারা ইসলামী ব্যাংকগুলোর বর্তমান কার্যক্রমকে বিতর্কিত করে পুনরায় মালিকানা ফেরত নেওয়ার জন্য এই শোডাউন করেছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত কয়েক মাসে শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেটে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার অস্বাভাবিক লেনদেন হওয়ার বিষয়টি মালিকানা ফেরত নেওয়ার গুঞ্জনকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিধিবহির্ভূত লেনদেন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা: শেয়ারবাজারে শেয়ার লেনদেন সংক্রান্ত কোনো ধরনের কারসাজি, অনিয়ম কিংবা বিধিবহির্ভূত লেনদেন হলে সেটি প্রাথমিকভাবে স্টক এক্সচেঞ্জ তদারকি করে। স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাথমিক তদারকিতে অনিয়ম দৃশ্যমান হলে পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে বিষয়টি জানানো হয়। এরই আলোকে কমিশনের নির্দেশে স্টক এক্সচেঞ্জে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী বিভিন্ন শাস্তি কিংবা জমিমানা আরোপ করতে পারে বিএসইসি। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিএসইসি স্টক এক্সচেঞ্জের বাইরে নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করে অনিয়মের তদন্ত করে থাকে। 

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্লক লেনদেনের বিষয়ে ডিএসইর উপ-মহাব্যবস্থাপক ও মুখপাত্র শফিকুর রহমান বলেন, ব্লক মার্কেটে বড় অংকের শেয়ার লেনদেন কোনো অপরাধ নয়। তবে কেউ যদি বাজার দরের চেয়ে উচ্চ দরে শেয়ার কিনে থাকেন কিংবা কোনো ধরনের বিধিবহির্ভূত লেনদেন করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আমাদের সার্ভেইল্যান্স বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে। বিধিবহির্ভূত লেনদেন হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন