নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার পণ্য
৬ মাসেও স্বাভাবিক হয়নি কার্গো ভিলেজ
বিজনেস ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬, ২১:০৫
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। কর্তৃপক্ষের চরম অযত্ন আর অব্যবস্থাপনায় সেখানে স্থবির হয়ে পড়েছে পণ্য খালাস কার্যক্রম।
স্ক্যানার সংকট, কোল্ড স্টোরেজের অভাব
এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতায় খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে
আমদানিকৃত কোটি কোটি টাকার মূল্যবান পণ্য। এতে করে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা বিশাল আর্থিক
ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে।
ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে হাহাকার: গত বছরের
সেই অগ্নিকাণ্ডে অনেক ব্যবসায়ীর স্বপ্ন আর কোটি কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।
সেই ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন করে অব্যবস্থাপনার যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন তারা। সরেজমিনে
দেখা গেছে, কার্গো ভিলেজের শেডগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বিপুল
পরিমাণ আমদানিকৃত কার্টন ও কন্টেইনার খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখা হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টির
এই মৌসুমে পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক্স, ওষুধ এবং তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল।
পণ্য নিতে আসা একজন আমদানিকারক ক্ষোভ প্রকাশ
করে বলেন, “আমরা চড়া মাশুল
দিয়ে বিমানে পণ্য আনি দ্রুত পাওয়ার জন্য। কিন্তু এখানে আসার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস
ও সিভিল এভিয়েশনের গাফিলতিতে আমাদের পণ্য দিনের পর দিন পড়ে থাকে। বৃষ্টিতে ভিজে লাখ
লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই।”
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ও ইনস্যুরেন্স জটিলতা:
কার্গো ভিলেজের এই বিশৃঙ্খলার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রপ্তানিমুখী খাতের
ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের
(বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান,
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এখনো কোনো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা ক্ষতিপূরণ পাননি।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “মালামাল পুড়ে যে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার বিপরীতে কোনো ইনস্যুরেন্স
মানি পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো অনৈতিক পন্থার ওপর দাঁড়িয়ে
আছে। যখনই ক্ষতির দাবি তোলা হয়, তখন তারা হাজারটা শর্তের বেড়াজাল আবিষ্কার করে। ফলে
আমাদের ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে।”
সংস্থাগুলোর কাদা ছোড়াছুড়ি: অব্যবস্থাপনার
দায় নিতে নারাজ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়েই দায় সারছে তারা। কার্গো
হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দাবি, তারা ২৪ ঘণ্টা সেবা
দিতে প্রস্তুত থাকলেও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অসহযোগিতার কারণে দেরি হচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক
(জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম বলেন, “আমাদের সক্ষমতা আছে ২৪ ঘণ্টাই ডেলিভারি দেওয়ার। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের উপস্থিতিতে পণ্য খালাস করতে হয়। বিকেলে ৫টার পর অনেক এজেন্টকে
আর পাওয়া যায় না, যার ফলে ডেলিভারি প্রক্রিয়া থমকে যায়।” অন্যদিকে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের
দাবি—বিমান বিকেল ৫টার পর আর সার্ভিস দিতে চায় না।
এছাড়া কার্গো ভিলেজে স্ক্যানার মেশিন প্রায়ই
নষ্ট থাকে এবং কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। ফলে সংবেদনশীল পণ্যগুলো দ্রুত
খালাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কাস্টমসের আশ্বাস: অব্যবস্থাপনা কাটাতে
ঢাকা কাস্টমস হাউজ নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ঢাকা কাস্টমস হাউজের জয়েন্ট কমিশনার
মো. কামরুল হাসান বলেন, “আমরা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। পণ্য খালাসের সময়সীমা
রাত ৮টা পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিভিল এভিয়েশন, বিমান এবং
কাস্টমস মিলে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে যাতে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি
কমে।”
সমাধানের অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা: রাজস্বের
একটি বড় অংশ আসে এই কার্গো ভিলেজ থেকে। অথচ আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে এটি এখন ব্যবসায়ীদের
জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু আশ্বাস নয়, অবিলম্বে অবকাঠামোগত
উন্নয়ন, স্ক্যানার সংখ্যা বাড়ানো এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অন্যথায়
বিমানবন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, সিভিল এভিয়েশন এবং
বিমান বাংলাদেশকে তাদের সেবার মান বাড়িয়ে দ্রুত এই সংকটের সমাধান করতে হবে। কার্গো
ভিলেজের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় ছয় মাস ধরে অব্যবস্থাপনা চলতে থাকা জাতীয় অর্থনীতির
জন্য অশনিসংকেত।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

