হামের বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু জুনে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ২১:৩৩
বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ছয়টি রোগের টিকা কিনতে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফকে ৬০৪ কোটি টাকা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
তিনি বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করে জুন মাস থেকে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে। এছাড়াও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে হামের টিকা সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সোমবার (৩০ মার্চ) সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এটি ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। উভয়পক্ষ পাঁচ বছর মেয়াদি একটি যৌথ স্বাস্থ্য সহযোগিতা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এতে সংক্রামক রোগ মোকাবিলা, ভবিষ্যৎ মহামারি প্রস্তুতি এবং সারভেইলেন্স সিস্টেম শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের সংক্রমণ হঠাৎ বাড়লেও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছি। মহাখালীতে একটি শিশুর মৃত্যুর পর বন্ধ থাকা আইসিইউ ইউনিট মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যে চালু করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, আইসোলেশন সুবিধা ও ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জ ও রাজশাহীতেও নতুন ভেন্টিলেটর পাঠানো হয়েছে এবং আরও ২০টি ভেন্টিলেটর সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ চালু, ভেন্টিলেটর সরবরাহ এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ড প্রস্তুতের মাধ্যমে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য মহামারি মোকাবিলায় আগাম শনাক্তকরন (আর্লি ডায়াগনোসিস) ও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া মা ও শিশুস্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, খুব শিগগিরই হামসহ ৬ রোগের টিকা আনার জন্য ৬০৪ কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া গেছে, চেষ্টা চলছে দ্রুত আনার জন্য। এরই মধ্যে ইউনিসেফকে টিকা আনার জন্য টাকা দেওয়া হয়েছে, এপ্রিল এর প্রথম সপ্তাহের মধ্যে টিকা চলে আসবে বলে আশা করছি।
মন্ত্রী বলেন, আমরা চাই না কোনো দেশ আমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দিক। পরিকল্পনার শুরু থেকেই আমরা আমাদের প্রয়োজন তুলে ধরবো, তাদের সক্ষমতা জানবো এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে পাঁচ বছরের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করবো।
এ লক্ষ্যে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হবে, যা আগামী মে মাসের মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করবে।
হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নিয়মিত টিকাদান ক্যাম্পেইন চললেও ২০১৮ সালের পর আর কোনো বড় ক্যাম্পেইন হয়নি। ফলে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, যারা ভ্যাকসিন নেয়নি, তাদের মধ্যেই হামের সংক্রমণ বেশি মারাত্মকভাবে দেখা যাচ্ছে।
সরকার এরইমধ্যে টিকা সংগ্রহে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। দ্রুত টিকা আমদানি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় নেওয়া তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বন্ধ থাকা আইসিইউ ১৮ ঘণ্টার মধ্যে চালু করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আইসোলেশন ওয়ার্ড, ভেন্টিলেটর এবং চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। রাজশাহী ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় নতুন ভেন্টিলেটর পাঠানো হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, টিকা এলে ভ্যাকসিন কর্মসূচি বাড়ানো হবে। আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। হামসহ শিশুরোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারিভাবে আরও ২০টি ভেন্টিলেশন প্রস্তুত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের পর দেশে হামের বিষয়ে কোনো ক্যাম্পেইন করা হয়নি। তাই সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে।
বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে সংক্রমণ রোগ, নার্সিং সেবা উন্নীতকরণ, আইসিইউ সেবাসহ বিভিন্ন রকমের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ৫ সদস্যের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রূপ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী মে মাসের মধ্যে এর রূপরেখা তৈরি করা হবে।
স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমাদের এ টিকার যে পেমেন্টটা এটা কিন্তু আমাদের অলরেডি আমরা ইউনিসেফকে পেমেন্ট করে ফেলেছি টাকাটা ইউনিসেফের কাছে আছে। এখন পারচেস কমিটির অনুমোদন পেয়ে গেলে আমরা তাদেরকে শুধু অর্ডারটা দেবো এবং আমাদের চলে আসবে ইনশাল্লাহ। আশা করছি এপ্রিলের ফার্স্ট উইক থেকে আমরা টিকা নিতে থাকব। টিকা আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
এদিকে, ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের টিকাদানের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বড় অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে; প্রায় পাঁচ লাখ শিশুর অবস্থা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ইউনিসেফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও ৪ লাখের মতো শিশু ঠিকমতো সব টিকা পায়নি এবং ৭০ হাজার (১ দশমিক ৫ শতাংশ) শিশু একেবারেই টিকা পায়নি। তারা বলছে, শহর অঞ্চলগুলোতে টিকা না পাওয়ার হার বেশি- মাত্র ৭৯ শতাংশ পুরোপুরি টিকা পেয়েছে, ২ দশমিক ৪ শতাংশ এক ডোজ টিকাও পায়নি এবং ৯ দশমিক ৮ শতাংশ টিকার সব ডোজ ঠিকমতো পায়নি; সেই তুলনায় গ্রামাঞ্চলগুলোতে ৮৫ শতাংশ শিশু টিকার সব ডোজ পেয়েছে।

