অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে মাদাগাস্কারের 'জেন-জি' প্রজন্ম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২০:০৯
মাদাগাস্কারে এক বছর আগের গণ-অভ্যুত্থানের সেই উল্লাস এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে। যে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে দেশটির পুরোনো সরকারকে হটিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করেছিল, এখন সেই তরুণ সমাজই নতুন জান্তা সরকারের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ধরপাকড় এবং তরুণ অ্যাক্টিভিস্টদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ১২ এপ্রিল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার
দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভ থেকে হেরিযো আদ্রিয়ামানানতেনাসহ চারজন প্রভাবশালী তরুণ নেতাকে
গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং অপরাধমূলক
ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও তাদের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ
ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে
ভর্তি হয়েছেন। জেন-জি মাদাগাস্কার আন্দোলনের নেতা হেরিযো এখনো কারাগারে বন্দি। এই ঘটনার
প্রতিবাদে গত বুধবার রাতে আরও দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মের
মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের
মাধ্যমে কর্নেল মাইকেল আন্দ্রিয়ানিরিনা যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন সাধারণ মানুষ বিশেষ
করে তরুণরা তাকে ‘ত্রাতা’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি
রাজোয়েলিনা দেশ ছেড়ে পালালে জনগণের মধ্যে নতুন দিনের আশা জেগেছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক
মাসেই সেই মোহভঙ্গ হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগগুলো হলো,
দুর্নীতিগ্রস্ত পুরোনো আমলা ও অভিজাত শ্রেণিকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে,
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হওয়ার পরও পানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ
নেই এবং নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার বদলে সরকার কেবল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার
চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নতুন সামরিক সরকার
পশ্চিমাদের পরিবর্তে রাশিয়ার সঙ্গে সখ্যতা বাড়াচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জান্তা প্রধান
আন্দ্রিয়ানিরিনা মস্কো সফর করেন এবং সেখান থেকে সামরিক ট্রাক, হেলিকপ্টার ও ট্যাংক
উপহার হিসেবে পান। এমনকি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীতে রুশ রক্ষীদের
উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে জান্তা সরকারের মুখপাত্র হ্যারি লরেন্ট রাহাজাসন। এই বিদেশি
হস্তক্ষেপ নিয়ে তরুণরা উদ্বিগ্ন, কারণ তারা একে ‘নতুন ধরনের পরাধীনতা’ হিসেবে দেখছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল মাদাগাস্কারের
বোর্ড মেম্বার কেতাকানদ্রিয়ানা রাফিতোসন বলেন, “এটি সেই একই দমনমূলক সংস্কৃতি যা আমরা
আগের সরকারের আমলেও দেখেছি। তরুণরা চেয়েছিল এই দুষ্টচক্র ভেঙে যাবে, কিন্তু বর্তমান
সরকার মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।”
উল্লেখ্য, ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষের দ্বীপ
রাষ্ট্র মাদাগাস্কার ভ্যানিলা ও রত্নপাথরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও রাজনৈতিক
অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম দরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে
দেশটির মাথাপিছু জিডিপি মাত্র ৫৪৫ ডলার। মাদাগাস্কারের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে
যে, মুক্তির আশায় তরুণরা যে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিল, তা এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের
দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

