দ্যা গার্ডিয়ানের তথ্য
ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে 'যৌন সহিংসতা'কে হাতিয়ার বানাচ্ছে ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৪
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি ও ঘরবাড়ি থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করতে ইসরায়েলি সেনা ও উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীরা 'যৌন সহিংসতা' ও 'যৌন হয়রানি'কে পদ্ধতিগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা
এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে
এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই পরিকল্পিত সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক পরিবার এলাকা
ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে এবং নিরাপত্তার অভাবে অল্পবয়সী মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধসহ বাল্যবিবাহের
হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
‘যৌন সহিংসতা এবং
পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক উচ্ছেদ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে
ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তল্লাশির নামে নগ্ন করা, স্পর্শকাতর অঙ্গে বেদনাদায়ক শারীরিক
পরীক্ষা, শিশুদের সামনে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন এবং সরাসরি ধর্ষণের হুমকির মতো ঘটনাগুলো নিয়মিত
হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা গত তিন বছরে অন্তত ১৬টি এই ধরনের চরম যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত
করেছেন। তবে সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্কের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী মুখ না খোলায় প্রকৃত সংখ্যা
আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ২০২৩ সাল
থেকে এই নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। ফিলিস্তিনি বসতিগুলোর ভেতরে ঢুকে বসতি স্থাপনকারীরা
কেবল মারধরই করছে না, বরং নারী ও শিশুদের টার্গেট করে যৌন হয়রানি চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে
পুরুষদের ওপরও পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। গত মাসে জর্ডান উপত্যকায় এক ফিলিস্তিনি
যুবককে বেঁধে তার যৌনাঙ্গে আঘাত করার মতো রোমহর্ষক ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া ফিলিস্তিনিদের
নগ্ন করে ছবি তুলে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত
করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে সরাসরি জনমিতির
ওপর। প্রতিবেদনে জরিপ করা দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা কেবল এই যৌন হয়রানির
হাত থেকে নিজেদের সম্মান ও পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতেই ঘরবাড়ি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নিয়েছেন। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মায়েরা এতটাই উদ্বিগ্ন যে, অনেক
ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে অন্য এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া
হচ্ছে। ভয়ে অনেক নারী কাজ হারিয়েছেন এবং স্কুলগামী ছাত্রীদের একটি বড় অংশ শিক্ষা জীবন
থেকে ছিটকে পড়েছে।
ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-ইসরায়েলের
তথ্যমতে, ইসরায়েলি প্রশাসনের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এই অপরাধকে উস্কে দিচ্ছে। সম্প্রতি
এক বন্দিকে গণধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত সেনাদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার ঘটনাটি
স্পষ্ট করে দেয় যে, ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন সহিংসতাকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এক প্রকার
‘সবুজ সংকেত’ দিয়ে
রেখেছে। এমনকি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটেও বন্দিদের ধর্ষণের বৈধতা নিয়ে আলোচনার ঘটনা
বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে।
পশ্চিম তীরের এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা উল্লেখ
করে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উগ্রপন্থী
বসতি স্থাপনকারীদের ‘ইহুদি সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে তাদের হাত থেকে ফিলিস্তিনিদের বাঁচাতে আন্তর্জাতিক
অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এসব অভিযোগের
বিষয়ে কোনো সদুত্তর দেয়নি। বর্তমানে পশ্চিম তীরের অন্তত ৮৩টি জনপদে চালানো এই গবেষণার
ফলাফল বিশ্ববাসীর সামনে এক চরম মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

