প্যালান্টিয়ারের নতুন 'ম্যানিফেস্টো' নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৬
মার্কিন ডাটা অ্যানালিটিক্স জায়ান্ট 'প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিস' সম্প্রতি তাদের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প এবং কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান নিকোলাস জামিস্কার লেখা বই ‘দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক’-এর একটি সারসংক্ষেপ সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। ২২ দফার এই ঘোষণাপত্র বা 'ম্যানিফেস্টো' প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকরা এটিকে ‘প্রযুক্তিগত ফ্যাসিবাদ’ বা 'টেকনোফ্যাসিজম' এবং মানব অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করছেন।
ম্যানিফেস্টোতে যা বলা হয়েছে
সাধারণত একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ
থেকে যেমন বাণিজ্যিক বক্তব্য আশা করা হয়, প্যালান্টিয়ারের এই ইশতেহার তার চেয়ে অনেক
বেশি উগ্র ও রাজনৈতিক। এতে বলা হয়েছে- প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য জাতীয় প্রতিরক্ষা
এবং সামরিক কাজে অংশ নেওয়া একটি "নৈতিক দায়িত্ব", তথাকথিত গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে
টিকিয়ে রাখতে হলে 'হার্ড পাওয়ার' বা সামরিক শক্তির প্রয়োগ অনিবার্য, ইশতেহারে নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক 'জাতীয় সেবা'
প্রবর্তন এবং জনজীবনে ধর্মের গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং প্যালান্টিয়ার দাবি
করেছে যে, কিছু সংস্কৃতি 'উন্নত' এবং অন্যান্য কিছু সংস্কৃতি 'পশ্চাৎপদ' ও 'ক্ষতিকর'।
তাদের এই অবস্থানকে বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন প্যালান্টিয়ার এত বিতর্কিত?
২০০৩ সালে সিআইএ-র অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত
এই কোম্পানিটি শুরু থেকেই গোয়েন্দা ও নজরদারি সফটওয়্যার তৈরির জন্য পরিচিত। বর্তমানে
তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এর মধ্যে- ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কৌশলগত
অংশীদার হিসেবে প্যালান্টিয়ারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গাজায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে
বা 'কিল লিস্ট' তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের
মতে, এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের
বিতর্কিত অভিবাসন অভিযানে নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহ করে প্যালান্টিয়ার ব্যাপক সমালোচনার
মুখে পড়েছে এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা এবং অন্যান্য দেশে ব্যক্তিগত তথ্য
বিশ্লেষণের মাধ্যমে নজরদারি চালানোর অভিযোগও তাদের পিছু ছাড়ছে না।
বেলজিয়ামের প্রযুক্তি দার্শনিক মার্ক কোকেলবার্গ
প্যালান্টিয়ারের এই ইশতেহারকে 'টেকনোফ্যাসিজম'-এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা
করেছেন। গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস সতর্ক করে বলেছেন যে, প্যালান্টিয়ার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মানবজাতির অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। অনলাইন ইনভেস্টিগেটিভ
প্ল্যাটফর্ম 'বেলিংক্যাট'-এর প্রতিষ্ঠাতা এলিয়ট হিগিন্স বলেন, প্যালান্টিয়ার কোনো
সাধারণ সফটওয়্যার কোম্পানি নয়। তারা প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা এবং পুলিশি সংস্থায় সফটওয়্যার
বিক্রি করে। ফলে তাদের এই ইশতেহার কেবল দর্শন নয়, বরং তাদের ব্যবসার স্বার্থে তৈরি
একটি বিপজ্জনক আদর্শ।
বিশ্লেষকদের মতে, প্যালান্টিয়ারের প্রভাব
নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেই বিভাজন তৈরি হয়েছে। জার্মানি, আয়ারল্যান্ড এবং ইউরোপীয়
পার্লামেন্টের অনেক রাজনীতিবিদ এই কোম্পানির নিরাপত্তা মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ
করে যুক্তরাজ্যে প্যালান্টিয়ারের সাথে স্বাস্থ্য সেবার চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে।
এমন এক চাপের মুখে কোম্পানিটি তাদের 'প্রো-ওয়েস্ট' বা পশ্চিমাপন্থী কঠোর অবস্থান জাহির
করার জন্যই এই ইশতেহার প্রকাশ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্যালান্টিয়ারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,
তারা ইসরায়েল এবং পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন করে কারণ তারা "পশ্চিমা সভ্যতায় বিশ্বাসী"।
তবে সমালোচকদের মতে, প্রযুক্তির আড়ালে এমন উগ্র রাজনৈতিক এজেন্ডা বিশ্বশান্তির জন্য
চরম হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

