সিএনএন- এর প্রতিবেদন
ভারতে আবর্জনার স্তূপে অমানবিক শিশুশ্রম ও আধুনিক দাসত্ব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৩৬
দূর থেকে দেখলে মনে হবে উত্তর ভারতের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কোনো এক বিশাল পাহাড়। কিন্তু কাছে গেলেই ভুল ভাঙে। এটি প্রকৃতির সৃষ্টি কোনো পাহাড় নয়, বরং মানুষের ফেলে দেওয়া আবর্জনার স্তূপ যা কয়েক তলা ভবনের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে গেছে। আর সেই বিষাক্ত বর্জ্যের চূড়ায় ছোট ছোট অবয়ব নড়াচড়া করতে দেখা যায়—ওরা শিশু। যাদের শৈশব হারাতাল দিচ্ছে প্লাস্টিক, ভাঙা কাচ আর বিষাক্ত রাসায়নিকের স্তূপে।
বিশ্বখ্যাত মানবিক আলোকচিত্রী এবং শিল্পী লিসা ক্রিস্টিন উত্তর ভারতের এই ল্যান্ডফিলগুলোতে শিশুদের কাজের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে কীভাবে দারিদ্র্য ও বাধ্যবাধকতা শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে এমন এক পেশায়, যা কার্যত 'আধুনিক দাসত্ব' বা 'জবরদস্তিমূলক শ্রম'-এর নামান্তর।
-69f2173e25b11.jpg)
লিসা ক্রিস্টিন জানান, ২০২৪ সালের শেষের
দিকে ভারতের প্রযুক্তি সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন নিয়ে কাজ করার সময় তিনি এই ল্যান্ডফিলগুলো
পরিদর্শন করেন। ভারতের এই বিশাল বর্জ্য স্তূপগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক। এগুলোতে মাঝেমধ্যেই
কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই মিথেন গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে অথবা বর্জ্যের পাহাড়
ধসে পড়ে।
পাহাড়ের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখা যায়
কেবল পরিত্যক্ত ফ্যাশন পণ্যের স্তূপ, মরিচা ধরা লোহা, কাঁচের টুকরো, হাসপাতালের বর্জ্য,
সিরিঞ্জ এবং ইলেকট্রনিক বর্জ্য। পুরো এলাকার বাতাস পচা খাবার, পোড়া প্লাস্টিক এবং রাসায়নিকের
গন্ধে ভারী হয়ে থাকে। আর এই নরককুণ্ডের চূড়ায় ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজে নেমে পড়ে শিশুরা।
এই ল্যান্ডফিলের ওপর কাজ করা শিশুদের বেশিরভাগই
তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকে। অনেকে একা কাজ করে, আবার অনেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বস্তা
ভরে প্লাস্টিক, ধাতু বা কাপড় সংগ্রহ করে। লিসা লক্ষ্য করেছেন, নিজের শরীরের চেয়েও বড়
ওজনের বস্তা পিঠে নিয়ে হাঁটছে এক একটি ছোট্ট মেয়ে। এখানে কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম বা
'সেফটি গিয়ার' নেই। শিশুদের হাতে নেই গ্লাভস, পায়ে নেই মজবুত বুট; বেশিরভাগই ছেঁড়া
স্যান্ডেল পরে বিষাক্ত বর্জ্যের ওপর হাঁটছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা -র কনভেনশন নম্বর
১৮২ অনুযায়ী, যেসব কাজ শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা নৈতিকতার ক্ষতি করে, তা 'নিকৃষ্টতম
শিশুশ্রম' হিসেবে গণ্য। কারিগরিভাবে এই পরিবারগুলো এখানে স্বেচ্ছায় কাজ করছে মনে হলেও,
বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। যখন টিকে থাকাই দায়, তখন শ্রম
আর ঐচ্ছিক থাকে না, তা হয়ে ওঠে বাধ্যতামূলক।
বর্জ্যের এই পাহাড় কেবল দুর্গন্ধই ছড়ায়
না, এটি মরণব্যাধির আঁতুড়ঘর। লিসা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন রাসায়নিক এবং দূষিত
বর্জ্যের সংস্পর্শে শিশুদের ত্বকে স্থায়ী ইনফেকশন তৈরি হচ্ছে। সিরিঞ্জের খোঁচায় হেপাটাইটিস
এবং টিটেনাস হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। দিনরাত আবর্জনা পোড়া বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের
সঙ্গে শরীরে ঢুকছে আর টাইফয়েড ও কলেরার মতো রোগ এখানকার নিত্যসঙ্গী। এই শিশুরা বড়
হওয়ার আগেই তাদের শরীরে দানা বাঁধছে মারাত্মক সব রোগ। অথচ তাদের আয়ের পরিমাণ দিনে মাত্র
কয়েক ডলার, যা নূন্যতম মজুরির চেয়েও অনেক কম।
ল্যান্ডফিলের এই শ্রমিকদের বড় অংশই অভিবাসী
অথবা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের কোনো বৈধ নথিপত্র নেই। ফলে তারা আনুষ্ঠানিক কোনো
চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন না। অনেক সময় তারা স্থানীয় ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে
চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এই ঋণের জাল থেকে তারা আর বের হতে পারেন না। ফলস্বরূপ,
শিশুরা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই এই অদৃশ্য ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্মে। তারা পড়াশোনার সুযোগ
পায় না, বরং শৈশব থেকেই ঋণের কিস্তি মেটাতে এই বিষাক্ত পাহাড়ে কাজ শুরু করে। লিসা জানান,
তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোর ল্যান্ডফিলেও একই চিত্র দেখেছেন, তবে ভারতে শিশুদের
এই অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রকট।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও লিসা কিছু শ্রমিকের মধ্যে আত্মমর্যাদা বা গর্ব খুঁজে পেয়েছেন। এক ব্যক্তি তাকে বলেন, “আমি আমার কাজ নিয়ে গর্বিত। আমি আমার পরিবারকে খাওয়াচ্ছি এবং সমাজকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করছি।”
-69f2174e63e2a.jpg)
কিন্তু এই গর্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক
নিষ্ঠুর বৈশ্বিক সত্য। উন্নত বিশ্ব যে আবর্জনা ফেলে দিচ্ছে, সেই আবর্জনার পাহাড় থেকেই
বেঁচে থাকার রসদ খুঁজছে এই শিশুরা।
লিসা ক্রিস্টিন বলেন, “সে তার কাজ নিয়ে গর্বিত হতে পারে, কিন্তু
সেই বিশ্ব সম্প্রদায় যারা তার শ্রমের ওপর ভিত্তি করে সুবিধা ভোগ করছে, তারা এই শিশুদের
চোখের সামনে দেখতেও অস্বীকার করে।”
উত্তর ভারতের ল্যান্ডফিলগুলোতে শিশুদের
এই জীবন 'পারিবারিক কাজ' হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হলেও বাস্তবে এটি একটি বড় মানবাধিকার
লঙ্ঘন। আইনত শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও দারিদ্র্যের কশাঘাত সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
লিসা ক্রিস্টিনের তোলা এই ছবিগুলো বিশ্ববিবেকের কাছে একটিই প্রশ্ন রাখে—বিলাসিতার বর্জ্য
স্তূপের নিচে আর কত শিশুর শৈশব চাপা পড়ে থাকবে?
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

