আমেরিকার প্রতিটি পদক্ষেপ সারা বিশ্বে গুরুত্ব বহন করে: রাজা চার্লস
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৩৮
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী বা 'সেমি কুইনকুইসেনটিনিয়াল' উদযাপনের অংশ হিসেবে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন ব্রিটিশ রাজা চার্লস। সফরের দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন তিনি। গত ৩৫ বছরের মধ্যে কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যের এটাই প্রথম কংগ্রেস ভাষণ।
ভাষণে রাজা চার্লস ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যকার 'বিশেষ
সম্পর্ক' বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি ন্যাটো জোটের গুরুত্ব, ইউক্রেন রক্ষা
এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজার এই বক্তব্য মূলত
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির প্রতি একটি সূক্ষ্ম ও কূটনৈতিক
আবেদন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র তার পুরনো ইউরোপীয় মিত্রদের থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। কংগ্রেসের
হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ডায়াস থেকে দেওয়া বক্তব্যে রাজা চার্লস বলেন, “আমেরিকার শব্দ বা বাণীর যেমন ওজন ও গভীরতা
রয়েছে, তেমনি এই মহান জাতির প্রতিটি পদক্ষেপ সারা বিশ্বের জন্য আরও বেশি গুরুত্ব বহন
করে।”
তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা এই
মৈত্রী ঐতিহাসিক এবং অনন্য। তবে ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি সুকৌশলে মার্কিন গণতন্ত্রের
ভারসাম্য রক্ষার প্রশংসা করেন। ব্রিটিশ আইনি ইতিহাসের ভিত্তি 'ম্যাগনা কার্টা'-র প্রসঙ্গ
টেনে তিনি বলেন, নির্বাহী ক্ষমতা যে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের অধীন—সেই নীতি দুই
দেশের অভিন্ন মূল্যবোধের অংশ। ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা রাজার এই মন্তব্যকে
করতালি দিয়ে স্বাগত জানান।
ইউক্রেন প্রসঙ্গে রাজা চার্লস বলেন, “ইউক্রেন ও সেদেশের সাহসী জনগণের জন্য আমাদের
অবিচল সংকল্প থাকতে হবে। একটি স্থায়ী ও ন্যায়বিচারভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এর
কোনো বিকল্প নেই।” তিনি ন্যাটো জোটের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, উত্তর আটলান্টিক
থেকে শুরু করে আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়া পর্যন্ত—সবখানেই ন্যাটোর সক্ষমতা আমাদের নাগরিকদের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক
সময়ে ন্যাটোর অর্থায়ন এবং ইউক্রেনে সহায়তা প্রদান নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় রাজার এই
বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়াও তিনি ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র
ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ত্রিদেশীয় সাবমেরিন চুক্তি 'অকুস'- কে সমর্থন জানিয়ে এটিকে
ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রতিরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ব্রিটিশ পণ্যের
ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছেন, তখন রাজা চার্লস দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের
বিশালতা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে বার্ষিক ৪৩০ বিলিয়ন
ডলারের বাণিজ্য সচল রয়েছে, যৌথ বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার এই বিশাল
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আটলান্টিকের দুই পাড়েই লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে
আর এই শক্তিশালী বাণিজ্যিক ভিত্তিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদী আন্দোলনের সঙ্গে
যুক্ত রাজা চার্লস মার্কিন প্রাকৃতিক সম্পদের প্রশংসা করে বলেন, টেডি রুজভেল্ট যে প্রাকৃতিক
ঐশ্বর্যের কথা বলে গেছেন, তা আজ হুমকির মুখে। তিনি বলেন, “আমরা যদি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার পতনকে উপেক্ষা
করি, তবে তা কেবল জীববৈচিত্র্য নয়, বরং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির
ভিত্তিকেও ধ্বংস করে দেবে।”
কংগ্রেসে ভাষণের আগে হোয়াইট হাউসে রাজা
চার্লসকে বর্ণাঢ্য সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে
ব্যক্তিগত মতপার্থক্য এবং গত বছর জেলেনস্কির সফরের সময়কার তিক্ততা এড়াতে দুই নেতার
মূল বৈঠকটি লোকচক্ষুর অন্তরালে অনুষ্ঠিত হয়। রাতে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত স্টেট ডিনারে
রাজা চার্লস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ব্রিটিশ
সাবমেরিন 'এইচএমএস ট্রাম্প'-এর একটি ঘণ্টা উপহার দেন।
রসিকতা করে রাজা বলেন, “আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হলে কেবল
এই ঘণ্টাটি বাজাবেন।” ডিনারে ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দাবি করেন যে, ইরান সামরিকভাবে
পরাজিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “রাজা চার্লস আমার সঙ্গে একমত যে, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র গড়তে
দেওয়া হবে না।” যদিও ইরানের বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের
সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছুটা কূটনৈতিক দূরত্ব রয়েছে।
রাজার এই জমকালো সফরের মাঝেই কিছু অস্বস্তিকর
প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। মার্কিন কংগ্রেসে সম্প্রতি জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত গোপন ফাইল
প্রকাশের বিল পাস হয়েছে। এই বিতর্কের জেরে রাজা চার্লস ইতিমধ্যে তার ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে
রাজকীয় উপাধি থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এমনকি মার্কিন হাউজ ওভারসাইট কমিটি প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এছাড়া ভার্জিনিয়া জুফ্রে (এপস্টাইন কেলেঙ্কারির
অন্যতম ভুক্তভোগী)-র পরিবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে, রাজা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে দেখা
করার কোনো পরিকল্পনা করেননি। রিপাবলিকান সিনেট মেজরিটি লিডার জন থুন রাজার সফরকে স্বাগত
জানিয়ে বলেন, ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র।
অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক লিডার চাক শুমার
বলেন, “রাজা চার্লসের
এই সফর প্রেসিডেন্টকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ন্যাটোর মতো মিত্র জোটগুলো আমেরিকার নিরাপত্তার
জন্য কতটা অপরিহার্য।”
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

