হাইতি ও সিরীয় অভিবাসীদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে সুপ্রিম কোর্টে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪১
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লক্ষাধিক হাইতিয়ান ও সিরীয় অভিবাসীর ‘টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) বা সাময়িক সুরক্ষা মর্যাদা বাতিল করার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে শুনানি শুরু করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) ওয়াশিংটনে সুপ্রিম
কোর্টের বিচারপতিরা এ বিষয়ে উভয় পক্ষের যুক্তি শুনবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ
যদি আদালত বৈধ বলে ঘোষণা করে, তবে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস করা কয়েক
লাখ মানুষ রাতারাতি নির্বাসনের ঝুঁকিতে পড়বেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার রায় কেবল
হাইতি বা সিরিয়া নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস কর্মসূচির অধীনে থাকা অন্যান্য দেশের
নাগরিকদের ভবিষ্যতের ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে।
১৯৯০ সালে প্রবর্তিত টিপিএস কর্মসূচির
অধীনে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নিজের দেশে ফিরতে অক্ষম
নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে বসবাসের ও কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। যদিও এটি
নাগরিকত্বের কোনো পথ তৈরি করে না, তবে এটি জীবন বাঁচানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কবচ
হিসেবে কাজ করে আসছে। চলতি বছরের শুরুতে দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার সময়
প্রায় ১৩ লাখ মানুষ এই সুরক্ষার অধীনে ছিল। তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন
এই কর্মসূচিটি সংকুচিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট জরুরি ভিত্তিতে
দেওয়া এক আদেশে ৩ লাখের বেশি ভেনেজুয়েলান নাগরিকের টিপিএস মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার অনুমতি
দিয়েছিল। এবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সিরিয়া ও হাইতি।
সাবেক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)
সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোম গত বছর এক বিবৃতিতে বলেছিলেন যে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ার
দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর নতুন সিরীয় সরকার "স্থিতিশীল
প্রাতিষ্ঠানিক শাসনের" দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে সেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি আর নেই।
অন্যদিকে হাইতির ক্ষেত্রেও একই যুক্তি
দিয়েছে প্রশাসন। দেশটিতে বর্তমানে ভয়াবহ গ্যাং সহিংসতা চললেও নোমের দাবি ছিল, হাইতিবাসীদের
নিরাপদে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেখানে কোনো ‘অস্বাভাবিক বা অস্থায়ী শর্ত’ বিদ্যমান
নেই। অথচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে হাইতিকে বসবাসের জন্য অত্যন্ত
বিপজ্জনক বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে।
টিপিএস বাতিলের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে
হাইতি ও সিরিয়ার নাগরিকরা পৃথকভাবে ওয়াশিংটন ডি.সি. এবং নিউ ইয়র্কের ফেডারেল আদালতে
মামলা করেছিলেন। নিম্ন আদালতে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানো হলেও
সুপ্রিম কোর্ট এখন এই মামলা দুটির সম্মিলিত শুনানি করছে। প্রশাসনের আইনজীবীদের দাবি,
টিপিএস মর্যাদা বাড়ানো বা বাতিল করা সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের (প্রেসিডেন্টের)
এখতিয়ার। অন্যদিকে অভিবাসী অধিকার কর্মীদের দাবি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ না করেই রাজনৈতিক
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেশটির মৌলিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন।
ট্রাম্প প্রশাসন গত এক বছরে মোট ১৩টি দেশের
নাগরিকদের টিপিএস মর্যাদা প্রত্যাহারের চেষ্টা চালিয়েছে। ইতিমধ্যে আফগানিস্তান, হন্ডুরাস,
ভেনিজুয়েলা এবং ইয়েমেনের নাগরিকদের সুরক্ষা কবচ সফলভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে
মিয়ানমার, ইথিওপিয়া এবং দক্ষিণ সুদানের সুরক্ষাও বাতিলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা আদালতে
বিচারাধীন।
যদি সুপ্রিম কোর্ট সিরিয়া ও হাইতির ক্ষেত্রে
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায় দেয়, তবে তা একটি নজির স্থাপন করবে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসন
খুব সহজেই সব দেশের জন্য টিপিএস কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারবে। এর সরাসরি
প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার শিশুর ওপর, যাদের বাবা-মা অভিবাসী
এবং যারা টিপিএস-এর মাধ্যমে আইনি নিরাপত্তা পাচ্ছেন।
আদালতে লড়াই চললেও মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি
পরিষদ সম্প্রতি একটি বিল পাস করেছে, যেখানে হাইতিয়ান অভিবাসীদের সুরক্ষার মেয়াদ আরও
তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে এই বিল পাসের
সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতারা এই বিষয়টিকে
‘মানবিক বিপর্যয়’
হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাস্তবতা হলো, সিরিয়া আসাদ পরবর্তী সময়ে এক ধরনের ভঙ্গুর অবস্থার
মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশ পুনর্গঠনে আরও অনেক সময়ের প্রয়োজন। অন্যদিকে, হাইতিতে বর্তমানে
সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্সসহ দেশের বড় অংশ অপরাধী
চক্রের দখলে। এমতাবস্থায় অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো মানে তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে
দেওয়া বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মীরা।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের দিকে তাকিয়ে
আছেন কয়েক লাখ মানুষ। অনেকে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ঘর-সংসার পেতেছেন,
নিয়মিত ট্যাক্স দিচ্ছেন এবং মার্কিন অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। বুধবারের
শুনানি শেষে চূড়ান্ত রায় আসতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের
এই আক্রমণাত্মক অভিবাসন নীতি যদি সফল হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক ভাবমূর্তি যেমন
ক্ষুণ্ণ হবে, তেমনি তৈরি হবে এক বিশাল সামাজিক অস্থিরতা।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

