Logo

আন্তর্জাতিক

জ্বালানি ও সার সংকটে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৫

জ্বালানি ও সার সংকটে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের দাবানল বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যারা দীর্ঘকাল ধরে জ্বালানি তেল ও সারের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন ভয়াবহ সরবরাহ সংকটের মুখে পড়েছে। এই শূন্যতা পূরণে বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলো। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কড়া সতর্কতা উপেক্ষা করেই জাকার্তা থেকে ম্যানিলা—সবখানেই এখন মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি ও কৃষিপণ্য আমদানির উৎসব শুরু হয়েছে।

মঙ্গলবার ব্রুনাইয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। বৈঠকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা মানে হলো ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পুতিনকে আর্থিক মদত দেওয়া। কালাস দেশগুলোকে বৃহত্তর স্বার্থ’ দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে। তবে এই সতর্কতা আসিয়ান দেশগুলোর কানে খুব একটা পৌঁছাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কৃষি উৎপাদন সচল রাখা এখন দেশগুলোর জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক ঝালাই করে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো সম্প্রতি মস্কোতে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরপরই জাকার্তা ঘোষণা করেছে যে তারা রাশিয়া থেকে ১৫০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে। ফিলিপাইন আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হলেও গত মার্চ মাসে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো রুশ তেলের চালান গ্রহণ করেছে তারা। সার আমদানির জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে থাইল্যান্ড। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের আগেই রাশিয়ার সঙ্গে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করেছিল, যা বর্তমান জ্বালানি সংকটে আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এমনকি মিয়ানমারও রাশিয়ার সঙ্গে পরমাণু শক্তি নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

এই সংকট রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার যে চেষ্টা চালিয়েছিল, এশীয় দেশগুলোর এই জোরালো সাড়া সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। একদিকে তেলের আকাশচুম্বী দাম, অন্যদিকে সমুদ্রপথে রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক ছাড় সব মিলিয়ে রাশিয়ার পকেটে এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মুনাফা ঢুকছে। সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের গবেষক ইয়ান স্টোরি বলেন, পুতিনকে এই অঞ্চলে এমন একজন শক্তিশালী মানুষ’ হিসেবে দেখা হয় যিনি পশ্চিমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। এই ভাবমূর্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেশ জনপ্রিয়।”

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পুতিন ও রাশিয়ার গ্রহণযোগ্যতা পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি। ইকোনমিস্ট-এর ২০২৪ সালের জরিপে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ চায় রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে জয়লাভ করুক। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপে ইন্দোনেশিয়ার ৬৪ শতাংশ মানুষ রাশিয়ার প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে, যেখানে আমেরিকার ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৪৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া ফিলিস্তিন ইস্যুকে সমর্থন করায় মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে (যেমন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া) রাশিয়ার প্রতি বিশেষ সহানুভূতি কাজ করে। এছাড়া অতীতের আফগান যুদ্ধ বা চেচনিয়া যুদ্ধের স্মৃতি বর্তমান প্রজন্মের কাছে ফিকে হয়ে গেছে।

মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে বাইডেন-ট্রাম্প প্রশাসন রুশ তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেছিল। ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর চাপের মুখে এই ছাড়ের মেয়াদ আরও ৩০ দিন বাড়ানো হয়েছে। তবে আমেরিকা যদি পুনরায় নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে, তবে এশীয় দেশগুলোর তেল কেনার আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লেসজেক বুজিনস্কি মনে করেন, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে মূলত বিশ্বের কাছে নিজেদের নিরপেক্ষ’ অবস্থানের বার্তা দিতে চায়।

তারা ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চায় যে, ইন্দোনেশিয়া কারো ফরমায়েশি আদেশ মানবে না। জ্বালানি তেল ছাড়াও পারমাণবিক বিদ্যুৎ রাশিয়ার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবেশের একটি বড় রাস্তা করে দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার রাশিয়ার প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলো এখন তাদের জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে রাশিয়া নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

আগামী জুন মাসে রাশিয়ার কাজানে আসিয়ান-রাশিয়া সম্পর্কের ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও সেখানে বড় কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবুও ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য এটি হবে এক বিশাল বিশ্বজয়ের ছবি। এই সম্মেলন বিশ্বকে দেখিয়ে দেবে যে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার বন্ধুর অভাব নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান যুদ্ধের বিভীষিকা যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিচ্ছে, তখন রাশিয়ার জ্বালানি ও সার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছে যেন এক জীবনদায়ী ওষুধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে এখানে জীবনযাত্রার মান এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্বই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন