সিরিয়ায় যুদ্ধাপরাধের কাঠগড়ায় মিলিশিয়া প্রধান ফাদি সাকর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২০:০৯
ফাদি সাকর
সিরিয়ার দীর্ঘ এক দশকের রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ ও আসাদ শাসনের অবসানের পর এখন সময় এসেছে খতিয়ান মেলানোর। বাশার আল-আসাদ সরকারের অন্যতম সহযোগী এবং কুখ্যাত মিলিশিয়া নেতা ফাদি সাকরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অকাট্য প্রমাণ নিয়ে মামলা তৈরির জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে সিরিয়ার জাতীয় তদন্ত কমিশন। দামেস্কের তাদামন এলাকায় সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও গুমের ঘটনায় সাকরের প্রধান ভূমিকার বিষয়টি এখন বিশ্বের সামনে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
সিরিয়ার ‘ন্যাশনাল কমিশন
ফর ট্রানজিশনাল জাস্টিস’-এর পক্ষ থেকে
জানানো হয়েছে, ফাদি সাকরের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আইনি নথি প্রস্তুত করা হচ্ছে। কমিশনের
ডেপুটি চেয়ার ও সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জোহরা আল-বারাজি জানিয়েছেন,
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই মামলা সাজানো হচ্ছে। কমিশন একটি স্বাধীন
সংস্থা হিসেবে কাজ করছে এবং তাদের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সিরিয়ার বিচার বিভাগের কাছে
হস্তান্তর করা হবে। বিচার বিভাগই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাকরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি
পরোয়ানা জারির বিষয়ে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের
পতনের পর সিরিয়ার নতুন সরকার শুরুতে কৌশলগত কারণে সাকরের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতা
করেছিল। এতে ভুক্তভোগী জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে আল-বারাজি আশ্বস্ত
করেছেন যে, এখন সময় বদলেছে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের উপকণ্ঠে তাদামন
এলাকাটি ২০১৩ সালে এক বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সেই সময় ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সেস নামক
মিলিশিয়া বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন ফাদি সাকর। অভিযোগ রয়েছে, তার নির্দেশেই
শত শত নিরীহ মানুষকে ধরে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত সপ্তাহে
সিরিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমজাদ ইউসুফ নামক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার
করেছে, যে সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। একটি ল্যাপটপ থেকে উদ্ধার হওয়া ভিডিও ফুটেজে
দেখা গেছে, ইউসুফ চোখ বাঁধা সাধারণ মানুষকে গর্তের সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি করছে এবং
পরে তাদের লাশের ওপর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও অ্যাক্টিভিস্টদের দাবি,
আমজাদ ইউসুফ ছিল সাকরের আজ্ঞাবহ এক সাধারণ সৈন্য মাত্র। মূল পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতা
ছিলেন ফাদি সাকর।
ফাদি সাকর অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সকল
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তিনি
কেবল সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেই এসব গণহত্যার কথা জেনেছেন। সাকর দাবি করেন, তিনি ২০১৩
সালের জুনে কমান্ডারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, অথচ ভিডিওর ঘটনাগুলো এপ্রিল মাসের। তবে আমস্টারডাম
ভিত্তিক গবেষক অধ্যাপক উগুর উমিত উনগোর এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
তিনি জানান, তাদামন গণহত্যা কোনো একদিনের
বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ২০১৩ থেকে পরবর্তী কয়েক বছর ধরে চলা এক ধারাবাহিক নৃশংসতা।
সাকরের মেয়াদেও অক্টোবর মাসে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ এখন তদন্তকারীদের হাতে।
মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান হিসেবে ‘চেইন অফ কমান্ড’ অনুযায়ী তিনি দায় এড়াতে পারেন না।
তাদামন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ফাদি
সাকরকে নিয়ে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। ৩২ বছর বয়সী অ্যাক্টিভিস্ট আহমেদ আল-হমসি
বলেন, "তাদামনে ফাদি সাকরের হুকুম ছাড়া একটা পাতাও নড়ত না। ডাকাতি, গ্রেফতার,
গুম কিংবা খুন—সবই হতো তার নির্দেশে। আমজাদ ইউসুফের গ্রেফতারের চেয়ে ফাদি সাকরের বিচার
আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি হবে আমাদের জন্য দ্বিতীয় বিজয় দিবস।" সিরিয়ার
নতুন সরকার এতদিন সাকরের মতো ব্যক্তিদের আসাদপন্থি ইনসার্জেন্ট বা বিদ্রোহীদের দমনের
কাজে ব্যবহার করছিল। কিন্তু এখন সরকার বুঝতে পারছে যে, জনরোষ প্রশমন এবং দীর্ঘমেয়াদী
শান্তির জন্য এই অপরাধীদের বিচার করা অপরিহার্য।
সিরিয়া এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এক
দশকের যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ক্ষতে প্রলেপ
দিতে হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি ফাদি সাকরের মতো
উচ্চপদস্থ অপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হয়, তবে তা হবে সিরিয়ার বিচারব্যবস্থার জন্য এক
মাইলফলক। এটি সাম্প্রদায়িক সংঘাত রোধে এবং জাতীয় সংহতি বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।
জোহরা আল-বারাজি সম্প্রতি তাদামন এলাকা
পরিদর্শন করেছেন এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন,
"সাকরের থেকে সরকারের যে রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে
জনগণের মাঝে তৈরি হওয়া অসন্তোষের মূল্য অনেক বেশি। তাই তাকে বিচারের আওতায় আনা এখন
সময়ের দাবি।" তাদামনের বাতাসে আজও পোড়া লাশের গন্ধ আর স্বজন হারানোদের আহাজারি
মিশে আছে। ফাদি সাকরের বিচার হলে হয়তো সেই দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটবে এবং সিরিয়া একটি
ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

