রাশিয়ার শস্যবাহী জাহাজ জব্দে ইসরায়েলকে ইউক্রেনের অনুরোধ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২০:১৯
প্যানরমিটিস
রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের অধিকৃত অঞ্চল থেকে লুণ্ঠন করা শস্যবাহী একটি জাহাজ নিয়ে কিয়েভ ও তেল আবিবের মধ্যে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন এক কূটনৈতিক লড়াই। ইউক্রেনের দাবি, ‘প্যানরমিটিস’ নামের একটি জাহাজ রাশিয়ার চুরি করা শস্য নিয়ে ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই জাহাজটি জব্দ করার পাশাপাশি এর নাবিকদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং শস্যের নমুনা সংগ্রহের জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।
ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেল রুসলান ক্রাভচেনকো
গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, প্যানরমিটিস
জাহাজটি বর্তমানে ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের পথে রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই জাহাজে থাকা
শস্যের একটি বড় অংশ ইউক্রেনের সেই সব অঞ্চল থেকে আনা হয়েছে যা বর্তমানে রাশিয়ার দখলে
রয়েছে। ক্রাভচেনকো বলেন, "আমরা ইসরায়েলি অংশীদারদের কাছে অনুরোধ করছি যেন জাহাজ
ও এর পণ্যগুলো জব্দ করা হয়। সেই সঙ্গে জাহাজের নথিপত্র তল্লাশি, শস্যের নমুনা পরীক্ষা
এবং ক্রু সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।" ইউক্রেনের দাবি,
এর আগে অন্য একটি জাহাজ থেকে এই শস্যগুলো প্যানরমিটিসে লোড করা হয়েছিল।
ইউক্রেনের এই অনুরোধকে কেন্দ্র করে দুই
দেশের মধ্যে কথার লড়াই শুরু হয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার ইউক্রেনের
বিরুদ্ধে ‘টুইটার ডিপ্লোম্যাসি’
বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কূটনীতি করার অভিযোগ তুলেছেন। সারের দাবি, কিয়েভ যথাযথ আইনি
পথ অনুসরণ না করে আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছে। মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্স-এ
(সাবেক টুইটার) গিডন সার লিখেছেন, "টুইট করার আগে আশা করা হয়েছিল যে আপনারা একটি
আইনি অনুরোধ জমা দেবেন। কিন্তু আপনারা আপনাদের নিজস্ব কারণে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইউক্রেনের অনুরোধটি পরীক্ষা করে দেখছে।" এর আগে
ইসরায়েল দাবি করেছিল যে, ইউক্রেন তাদের দাবির স্বপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ পেশ করতে
পারেনি।
প্যানরমিটিস জাহাজের গ্রিস-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা
প্রতিষ্ঠান ‘রয়্যাল মেরিটাইম
ইনক’ ইউক্রেনের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিষ্ঠানের
একজন কর্মকর্তা বলেন, "আমাদের কাছে থাকা শস্যের উৎস সংক্রান্ত সার্টিফিকেটসহ সব
বৈধ নথিপত্র প্রমাণ করে যে এই পণ্যগুলো সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার। অধিকৃত ইউক্রেন থেকে
কোনো শস্য নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।" এই ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন সরাসরি হস্তক্ষেপ
করেছে। মঙ্গলবার ইইউ জানিয়েছে যে, রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরের একটি জাহাজ
চুরি করা শস্য নিয়ে ইসরায়েলে যাওয়ার বিষয়ে তারা তেল আবিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ইইউ
সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তৃতীয় কোনো দেশের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি রাশিয়ার এই যুদ্ধপ্রচেষ্টায়
সহায়তা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ
করেছে যে, ইসরায়েলের সঙ্গে এই বিষয়ে এটিই তাদের প্রথম বিতর্ক নয়। গত মার্চ মাস থেকে
কিয়েভ ‘অ্যাবিনস্ক’ নামের
অন্য একটি জাহাজ নিয়ে ইসরায়েলের কাছে বারবার আবেদন জানিয়ে আসছিল। ইউক্রেনের দাবি ছিল,
ওই জাহাজটিও চুরি করা শস্য বহন করছিল। কিন্তু কিয়েভের অনুরোধ উপেক্ষা করে ইসরায়েল জাহাজটিকে
পণ্য খালাস করতে এবং বন্দর ছাড়ার অনুমতি দেয়। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিকা
এক বিবৃতিতে বলেছেন, "আমরা আশা করি ইসরায়েল আবেগপ্রবণ বিবৃতি না দিয়ে বিষয়টিকে
গুরুত্বের সাথে নেবে।"
অধিকৃত অঞ্চল থেকে শস্য সংগ্রহের আইনি
ভিত্তি নিয়ে রাশিয়া এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেনি। প্যানরমিটিস জাহাজ নিয়ে
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তারা এই বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। ২০২২ সালে
শুরু হওয়া রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকেই মস্কো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শস্যভাণ্ডারগুলো
থেকে নিয়মিতভাবে পণ্য রপ্তানি করছে বলে অভিযোগ করে আসছে কিয়েভ। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির
জেলেনস্কি মঙ্গলবার এক হুঁশিয়ারিতে বলেছেন, যারা রাশিয়ার এই শস্য পাচার থেকে মুনাফা
অর্জনের চেষ্টা করবে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। ইতিমধ্যেই
কিয়েভে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ইউক্রেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনা ইসরায়েল
ও ইউক্রেনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের
অস্থিরতার মধ্যে ইসরায়েল যেমন রাশিয়ার সাথে একটি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়, তেমনি
ইউক্রেনও বিশ্বব্যাপী তাদের সম্পদ রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। হাইফা বন্দরে প্যানরমিটিস
জাহাজের ভাগ্য কী হয়, তার ওপর নির্ভর করছে এই দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণ।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

