ব্রিটিশ রাজনীতিতে অস্থিরতা, পদত্যাগে অনড় স্টারমার
অন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ২০:৪০
কিয়ার স্টারমার
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি পদত্যাগ করছেন না। মঙ্গলবার ডাউনিং স্ট্রিটে এক জরুরি ক্যাবিনেট মিটিংয়ে তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থাকার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি দলের ভেতরে থাকা তাঁর বিরোধীদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, কোনো আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি এবং দেশবাসী বর্তমান সরকারের কাছ থেকে সুশাসনের প্রত্যাশা করে।
ক্যাবিনেট সভায় স্টারমার বলেন, “বিগত নির্বাচনগুলোর
ফলাফলের দায়ভার আমি নিচ্ছি। আমরা পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়নের
দায়িত্বও আমার। গত ৪৮ ঘণ্টার রাজনৈতিক অস্থিরতা সরকারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে, যার
একটি বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ পরিবারগুলোকে। লেবার পার্টির
নিয়ম অনুযায়ী নেতাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। এখন পর্যন্ত
সেই প্রক্রিয়া কেউ শুরু করেনি। দেশের মানুষ চায় আমরা কাজ করি, তাই আমরা দেশ শাসনের
কাজ চালিয়ে যাব।”
স্টারমারের এই অনড় অবস্থানের মধ্যেই সরকারের
অভ্যন্তরে ফাটল দেখা দিয়েছে। সকালে মিয়াটা ফাহনবুলেহ প্রথম মন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ
করেছেন এবং সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এদিকে প্রবীণ লেবার নেতা জন
ম্যাকডোনেল অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং স্টারমারের বিরুদ্ধে
একটি সুপরিকল্পিত ‘অভ্যুত্থান’ বা ক্যু পরিচালনা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমার তাঁর
বক্তব্যে মূলত ওয়েস স্ট্রিটিংকেই লক্ষ্যবস্তু করেছেন। দলের নিয়ম অনুযায়ী, নেতৃত্বের
লড়াই শুরু করতে কমপক্ষে ৮১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। স্টারমার পরোক্ষভাবে স্ট্রিটিংকে
বার্তা দিয়েছেন যে, যদি ক্ষমতা দখলের সাহস থাকে, তবে যেন প্রয়োজনীয় সমর্থন নিয়ে সরাসরি
সামনে আসেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর তথ্যমতে, ইতিমধ্যে অন্তত ৮১ জন লেবার
এমপি স্টারমারের পদত্যাগ চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, লেবার পার্টির নিয়ম
কনজারভেটিভ পার্টির মতো নয়। কনজারভেটিভ পার্টিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক এমপির অনাস্থা পত্র
জমা পড়লে ভোট হওয়া বাধ্যতামূলক, কিন্তু লেবার পার্টিতে ৮১ জনের এই সংখ্যাটি কেবল একজন
নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করানোর জন্য প্রয়োজন। যতক্ষণ না কোনো সুনির্দিষ্ট নেতা ৮১
জন এমপির সমর্থন নিয়ে স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত স্টারমার আইনত পদে
বহাল থাকতে পারছেন। এই রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতেও।
নেতৃত্বের এই অনিশ্চয়তার কারণে সরকারের ঋণের খরচ বেড়ে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের
বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে
প্রশ্ন থাকলেও ড্যারেন জোন্স জানিয়েছেন যে, আগামীকাল নির্ধারিত ‘কিংস স্পিচ’ বা রাজার ভাষণ যথাসময়েই অনুষ্ঠিত
হবে।
গত সপ্তাহে ‘দ্য অবজারভার’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে
স্টারমার বলেছিলেন, তিনি আরও ১০ বছর ডাউনিং স্ট্রিটে থাকতে চান। তাঁর এই মন্তব্যকে
অনেক এমপি ‘অহংকার’ হিসেবে
দেখছেন, যা মার্গারেট থ্যাচার বা বরিস জনসনের শেষ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে
স্টারমার একদিকে যেমন নিজের ক্যাবিনেটকে সংহতি রাখার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে দলের ভেতরে
ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জে পড়েছেন। ড্যারেন জোন্স ইঙ্গিত দিয়েছেন
যে, স্টারমার সহকর্মীদের কথা শুনছেন, তবে তিনি পদত্যাগের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচী ঘোষণা
করবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটিই প্রশ্ন—ওয়েস
স্ট্রিটিং কি প্রয়োজনীয় সমর্থন নিয়ে স্টারমারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবেন, নাকি স্টারমার
এই বিদ্রোহ দমন করে পুনরায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন? আপাতত ডাউনিং স্ট্রিটের
ক্ষমতা যুদ্ধ ব্রিটিশ রাজনীতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

