আফগানিস্তানে বিচারের অপেক্ষায়
পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিহত ২৬৯ পরিবার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ২০:৫২
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ২৬৯ ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক দশকের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এটি অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই ঘটনাকে ‘সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করলেও পাকিস্তান দাবি করেছে যে, তারা কোনো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়নি।
উত্তর-পশ্চিম কাবুলের একটি পাহাড়ের ঢালে
অবস্থিত কবরস্থানে এখন শুধুই কান্নার শব্দ। সেখানে একটি বিশাল গণকবরের পাশে দাঁড়িয়ে
মাসুদা নামের এক নারী তাঁর ছোট ভাই মিরওয়াইসের কবর খুঁজছিলেন। কিন্তু দুই মাস আগে
পাকিস্তানি বিমান হামলায় মিরওয়াইস এতটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁর শরীরের
অবশিষ্টাংশ শনাক্ত করাই ছিল দুঃসাধ্য।
মাসুদা ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার ভাইয়ের শরীর টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল।
শুধু তাঁর পেটের একটি জন্মদাগ দেখে আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। পাকিস্তান মিথ্যা বলছে
যে এটি সামরিক ঘাঁটি ছিল। সেখানে কেবল রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসেছিল।”
গত ১৬ মার্চ স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ মিনিটে
কাবুলের ওমিদ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন হাসপাতালে তিনটি শক্তিশালী বোমা ফেলা হয়। এই হাসপাতালটি
গত এক দশক ধরে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিল। জাতিসংঘ নিশ্চিত করেছে যে, হামলায়
নিহতরা সবাই বেসামরিক নাগরিক এবং সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তবে পাকিস্তান এই অভিযোগ
সরাসরি অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ
চৌধুরী দাবি করেছেন, “ওই মাদকাসক্তদের আত্মঘাতী বোমারু হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং ওই কেন্দ্রটি
ছিল মূলত আত্মঘাতী হামলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।”
পাকিস্তানের এই দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। নিহত মোহাম্মদ আনোয়ারের ভাই সিদ্দিক ওয়ালিজাদা বলেন, “আমার ভাই অভাবের কারণে মাদকে আসক্ত হয়ে
পড়েছিল। সে কোনো সন্ত্রাসী ছিল না। পাকিস্তান নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে এখন মিথ্যা
অজুহাত দিচ্ছে।” হামলার প্রত্যক্ষদর্শী এক চিকিৎসক জানান, একটি বোমা সরাসরি নতুন ভর্তি
হওয়া রোগীদের ওয়ার্ডে আঘাত করে। অন্য দুটি বোমা প্রশাসনিক ভবন ও রোগীদের থাকার কাঠে
তৈরি ঘরে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো হাসপাতালটি অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিনিধি ফিওনা
ফ্রেজার বলেন, “এই হাসপাতালটি
জাতিসংঘের দপ্তরের মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে ছিল। এর কার্যক্রম সম্পর্কে সবাই জানত।
পুড়ে যাওয়ার কারণে অনেকের লাশ চেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।”
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাশের
হাড় ও দেহাংশ দেখেও সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা
২৬৯ এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের সাথে
তাদের সম্পর্ক ভালো থাকলেও বর্তমানে তা তলানিতে ঠেকেছে। পাকিস্তান অভিযোগ করছে যে,
তালেবান সরকার পাকিস্তানি তালেবান এবং বেলুচ বিদ্রোহীদের আশ্রয় দিচ্ছে। অন্যদিকে, কাবুল
এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পাকিস্তান নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে আফগানিস্তানের বেসামরিক
মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তালেবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বলেন,
“বেসামরিক নাগরিকদের
লক্ষ্যবস্তু করা একটি যুদ্ধাপরাধ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত এই ঘটনার তদন্ত করা
এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা।”
এই ভয়াবহ হামলার পর কাবুলের সাধারণ মানুষের
মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২১ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যে আপেক্ষিক শান্তি ফিরে এসেছিল,
এই হামলা তা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ৬ সন্তানের জনক মোহাম্মদ আনোয়ার বা ২৪ বছর বয়সী ফার্মাসিস্ট
ছাত্র মিরওয়াইস—যাঁরা সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেয়েছিলেন, তাঁদের মৃত্যু এখন
আফগানিস্তানে এক বড় মানবিক সংকটের প্রতীক। পরিবারগুলোর মধ্যে বিচারের আশা ক্ষীণ। এক
নিহতের ভাই বলেন, “আমরা অসহায় জাতি। আমাদের বিচার চাওয়ার শক্তি নেই। আমরা কেবল আল্লাহর
কাছে এই নিষ্ঠুরতার বিচার চাই।”
আফগান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা বিশ্লেষকদের
মতে, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত না করে, তবে এই অঞ্চলের উত্তেজনা
চরম আকার ধারণ করতে পারে, যা আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা করবে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

