মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক অধিকার হলো নিজের জীবন, শরীর ও সম্পত্তি রক্ষা করা। সভ্য সমাজে এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। কিন্তু বাস্তবতায় এমন অনেক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যখন হঠাৎ আক্রমণের মুখে একজন মানুষকে নিজের জীবন বা সম্পদ রক্ষার জন্য তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়। এই প্রতিরোধ কখনো কখনো আক্রমণকারীকে আঘাত করা কিংবা গুরুতর ক্ষতি করার পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।
দেশের ফৌজদারি আইনে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। দণ্ডবিধির (চবহধষ ঈড়ফব) ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। এই ধারাগুলোতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের বা অন্যের জীবন, শরীর কিংবা সম্পত্তি রক্ষার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাহলে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে সেই কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। অর্থাৎ, আইন মানুষের স্বাভাবিক আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
দণ্ডবিধির ৯৬ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করে করা কোনো কাজ অপরাধ নয়। তবে এই অধিকার সীমাহীন নয়। আইন এখানে কিছু যুক্তিসংগত সীমা নির্ধারণ করেছে, যাতে আত্মরক্ষার অজুহাতে কেউ অন্যায়ভাবে সহিংসতা বা প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালাতে না পারে। আত্মরক্ষার মূল নীতি হলো প্রতিরোধটি হতে হবে প্রয়োজনীয় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি হঠাৎ ছুরি নিয়ে আরেকজনের ওপর হামলা করল। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি নিজের জীবন রক্ষার জন্য হামলাকারীকে ধাক্কা দেন বা আঘাত করেন এবং তাতে হামলাকারী আহত হয়, তাহলে সেটি আত্মরক্ষার মধ্যে পড়বে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে যদি হামলাকারীর মৃত্যু ঘটে, তবুও তা আইনের দৃষ্টিতে বৈধ হতে পারে, যদি প্রমাণিত হয় যে ওই ব্যক্তি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ করেছিলেন।
তবে আইনের দৃষ্টিতে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। প্রথমত, আক্রমণটি হতে হবে বাস্তব এবং তাৎক্ষণিক। অর্থাৎ, কল্পিত বা ভবিষ্যতের আশঙ্কার ভিত্তিতে কাউকে আঘাত করা আত্মরক্ষা হিসেবে গণ্য হবে না। দ্বিতীয়ত, প্রতিরোধের মাত্রা আক্রমণের তুলনায় অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত হওয়া যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি শুধু হাত দিয়ে ধাক্কা দেয়, তার প্রতিক্রিয়ায় তাকে প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা সাধারণত আত্মরক্ষার সীমা অতিক্রম বলে বিবেচিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, আত্মরক্ষার অধিকার প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ নয়। আক্রমণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর হামলাকারীকে তাড়া করে আঘাত করা বা ক্ষতি করা আত্মরক্ষার মধ্যে পড়ে না। তখন সেটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, আত্মরক্ষার উদ্দেশ্য হলো বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, প্রতিশোধ নেওয়া নয়।
বাংলাদেশের আদালতগুলিও বিভিন্ন মামলার রায়ে আত্মরক্ষার এই নীতিগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। আদালত সাধারণত ঘটনার পরিস্থিতি, আক্রমণের প্রকৃতি, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং প্রতিরোধের মাত্রা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি দাবি করেন যে তিনি আত্মরক্ষার্থে কাজটি করেছেন। কিন্তু আদালত তখন খতিয়ে দেখেন, আসলেই কি সেখানে আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছিল, নাকি এটি ছিল অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মরক্ষার অধিকার শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও প্রয়োগ করা যায়। অর্থাৎ, যদি কেউ দেখেন যে কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, তাহলে তাকে রক্ষা করার জন্যও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ করা আইনত বৈধ হতে পারে। এই বিধান সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধকে উৎসাহিত করে।
তবে বাস্তব জীবনে আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেক সময় মানুষ আত্মরক্ষার নামে অতিরিক্ত সহিংসতা করে বসেন, যা পরবর্তীতে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তি আত্মরক্ষার অধিকার থাকা সত্ত্বেও ভয় বা আইনি অজ্ঞতার কারণে প্রতিরোধ করতে সাহস পান না। ফলে তারা গুরুতর ক্ষতির শিকার হন।
এ কারণে আত্মরক্ষার আইনি বিধান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে মানুষ একদিকে যেমন নিজের অধিকার রক্ষা করতে পারবেন, অন্যদিকে আইনের সীমা লঙ্ঘনের ঝুঁকিও কমবে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের মাধ্যমে এই বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা বাড়ানো প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা। যদি মানুষ মনে করেন যে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তাহলে তারা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতায় ঝুঁকতে পারেন। এটি সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষকে আত্মরক্ষার জন্য সহিংসতার পথে যেতে না হয়।
আত্মরক্ষার অধিকার মানবিক ও আইনি- দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংযম, বিচক্ষণতা এবং আইনের সীমা মেনে চলা জরুরি। আইন মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই তৈরি, প্রতিশোধ বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য নয়।
সচেতনতা, ন্যায়বিচার এবং শক্তিশালী আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে মানুষ নিরাপদ থাকবে এবং আত্মরক্ষার অধিকারকে অপব্যবহার করার সুযোগও থাকবে না।

