Logo

আইন ও বিচার

জনবান্ধব পুলিশ গড়তে চাই নৈতিকতা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার সংযত ব্যবহার

পুলিশ সপ্তাহের শপথ মাঠে কতটা বাস্তব?

Icon

মাসুম আহম্মেদ :

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ২০:০৪

পুলিশ সপ্তাহের শপথ মাঠে কতটা বাস্তব?

সংগৃহীত

দেশে শুরু হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬। প্রতিবছরের মতো এবারও নানা প্রতিশ্রুতি, শপথ, পদক বিতরণ ও উচ্চপর্যায়ের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ কি সত্যিই সেই জনবান্ধব পুলিশিং পাচ্ছে? থানায় গিয়ে কি এখনো মানুষ স্বস্তি নিয়ে কথা বলতে পারে? নাকি ভয়, হয়রানি ও ক্ষমতার প্রদর্শন এখনো সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি এক অদৃশ্য আতঙ্ক তৈরি করে রেখেছে?

আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা দুর্যোগকালীন সহায়তায় পুলিশের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। বহু পুলিশ সদস্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও বাস্তবতা যে, কিছু সদস্যের উগ্র আচরণ, দুর্নীতি, নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসৌজন্যমূলক আচরণ পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

গতকাল রাজধানীর বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের খবরের এই প্রতিবেদকের অভিযোগ করেন, অনেক থানায় এখনো মামলা নিতে অনীহা দেখা যায়। ভুক্তভোগীকে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, টাকার বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া কিংবা নিরীহ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও শোনা যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলে পুলিশের আচরণ নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোন মামলার তদন্তকালে উভয়পক্ষের কাছ থেকে নানা কৌশলে উৎকোচ  গ্রহণ করে রিপোর্টের নাম নিয়ে। তারপর যে বেশি টাকা দেয় তার পক্ষে রিপোর্ট দেয়া হয়। 

ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী কেএম খাইরুল কবীর গতকাল বলেন, পুলিশের পোশাক দেখলে মানুষের মনে নিরাপত্তার চেয়ে ভয়ের অনুভূতি জাগে- এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য সুখকর চিত্র হতে পারে না। পুলিশ মানেই শক্তি। আর শক্তির সঙ্গে যখন জবাবদিহির অভাব যুক্ত হয়, তখন ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে এডভোকেট শহিদুল ইসলাম বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে অস্ত্র দেওয়া হয় জনগণের নিরাপত্তার জন্য, আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য নয়। অথচ বাস্তবে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যেখানে তুচ্ছ বিষয়েও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, হেফাজতে নির্যাতন, কিংবা অমানবিক আচরণের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তির ক্ষতি করে না, বরং পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশকে সত্যিকারের জনবান্ধব করতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানসিক ও নৈতিক সংস্কার। একজন পুলিশ সদস্যের চরিত্র, নৈতিকতা, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও মানবিকতা তার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত। কারণ পুলিশ জনগণের সেবক- শাসক নয়। আইন প্রয়োগের নামে যদি নাগরিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, তাহলে সেই আইন প্রয়োগ কখনোই মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।

পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর সাফল্যের নানা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব মূল্যায়ন কতটা হয়? একজন কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা সাধারণ ব্যবসায়ী থানায় গিয়ে কেমন ব্যবহার পান- সেই অভিজ্ঞতাই আসলে পুলিশের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত। শুধু উচ্চপর্যায়ের সভা-সেমিনার নয়, জনগণের মতামত ও অভিযোগ বিশ্লেষণ করাও জরুরি।

দেশে পুলিশ সংস্কারের আলোচনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছে, উপনিবেশিক ধাঁচের পুলিশিং বদলাতে হবে। ব্রিটিশ আমলে পুলিশকে জনগণ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও যদি সেই মানসিকতা পুরোপুরি না বদলায়, তাহলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু, সহায়তাকারী ও আস্থার জায়গা।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পুলিশের আচরণ দ্রুত জনসমক্ষে চলে আসে। একটি ভুল আচরণ মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পুরো বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আবার অনেক ভালো কাজও মানুষের প্রশংসা পায়। তাই এখন আর ক্ষমতার জোরে কিছু চাপা রাখা সহজ নয়। জনগণের সঙ্গে আচরণে সংযম, পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা দেখানো ছাড়া বিকল্প নেই।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে ভুক্তভোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। কখনো অভিযোগ না নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। এতে মানুষ ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা হারায়। অথচ পুলিশের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত অভিযোগকারীকে নিরাপত্তা ও সম্মান দেওয়া। একজন অসহায় মানুষ যখন থানায় যায়, তখন সে রাষ্ট্রের কাছেই আশ্রয় চায়। সেখানে যদি অপমান বা ভয় পেতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের মানবিক চেহারাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এদিকে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা বাংলাদেশের খবরকে গতকাল বলেন, পুলিশ সদস্যদের কাজের চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত ছুটির অভাব, মানসিক চাপ ও রাজনৈতিক চাপ অনেক সময় আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, পুলিশ সদস্যদের মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। একজন ক্লান্ত ও হতাশ সদস্যের কাছ থেকে সবসময় মানবিক আচরণ আশা করাও বাস্তবসম্মত নয়। তবে সেটি কোনোভাবেই অন্যায় আচরণের বৈধতা হতে পারে না।

পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও নৈতিকতা ও মানসিক সক্ষমতার মূল্যায়ন বাড়াতে হবে। শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়, একজন সদস্য কতটা মানবিক, সহনশীল ও দায়িত্বশীল- সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রশিক্ষণে মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার, আচরণবিধি ও মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতার ওপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

অনেক উন্নত দেশে কমিউনিটি পুলিশিং সফল হয়েছে। সেখানে পুলিশ জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলে। স্কুল, বাজার, মহল্লা- সব জায়গায় পুলিশের ইতিবাচক উপস্থিতি থাকে। বাংলাদেশেও কমিউনিটি পুলিশিং চালু থাকলেও তা এখনো অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। এটিকে বাস্তবমুখী ও কার্যকর করতে হবে। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো পুলিশিং টেকসই হতে পারে না।

ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। থানায়, জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। অভিযোগ তদন্তে স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সদস্য অন্যায় করলে তাকে রক্ষা করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কারণ একজন অপরাধী পুলিশ সদস্য পুরো বাহিনীর জন্য কলঙ্ক।

পুলিশ সপ্তাহের মূল বার্তা হওয়া উচিত- “জনগণের সেবা, জনগণের আস্থা।” শুধু স্লোগান দিয়ে নয়, বাস্তব আচরণের মাধ্যমে সেই বার্তা পৌঁছাতে হবে। সাধারণ মানুষ পুলিশকে ভয় নয়, ভরসার প্রতীক হিসেবে দেখতে চায়। আইন প্রয়োগের সময় কঠোরতা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই কঠোরতার মধ্যেও মানবিকতা থাকতে হবে।

বর্তমান বাংলাদেশে সামাজিক অস্থিরতা, সাইবার অপরাধ, মাদক, কিশোর গ্যাংসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। একটি  পেশাদার, সৎ ও মানবিক পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।

পুলিশ সপ্তাহকে কেন্দ্র করে সরকারের উচিত মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলো গভীরভাবে মূল্যায়ন করা। শুধু পদক আর প্রশংসা নয়, জনগণের অভিযোগ ও হতাশাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। থানাকে হতে হবে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। একজন দরিদ্র মানুষও যেন সেখানে গিয়ে সম্মান নিয়ে কথা বলতে পারে- সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের অস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নয়, জনগণের নিরাপত্তার জন্য। পুলিশের ইউনিফর্ম যেন আতঙ্কের নয়, আস্থার প্রতীক হয়- এটাই হোক এবারের পুলিশ সপ্তাহের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। 

বাংলাদেশেরখবর/আরকে


Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন