ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কাল
উত্তপ্ত হতে পারে অধিবেশন
এম. ইসলাম
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৯
ফাইল ছবি
জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ সংস্কার প্রশ্নে সরকারি দল বিএনপির ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের বিরোধী দলের আচরণ। সরকার যদি সংস্কার প্রশ্নে ইতিবাচক অবস্থান নেয়, তাহলে সংসদের শুরুতেই কোনো সংঘাত বা অচলাবস্থা তৈরি করতে চায় না বিরোধী দল। তবে, উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রথম দিনেই তীব্র প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক উত্তাপের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংসদের বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিত মিলেছে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দল সংসদের ভিতরে কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে তা নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। সংসদ সহযোগিতামূলক পরিবেশে চলবে, নাকি শুরুতেই রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হবে- সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘বিএনপি যদি জনগণের কাছে প্রতিশ্রæতি দেওয়া জুলাই সনদ মেনে সংস্কার করে এবং পরির্বতনের পথে দেশকে নিয়ে যায় আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। যদি তারা বিপরীত পথে হাঁটে আমরা তার প্রতিবাদ করবে সংসদে এবং রাজপথে।’
জানা গেছে, জুলাই সনদ অনুযায়ী এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় নতুন রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংসদ সদস্যদের শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই নয়, বরং প্রথম ১৮০ কর্মদিবসের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল।
এ লক্ষ্যে একই দিনে দুটি শপথ অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়। কিন্তু শপথ গ্রহণের দিন বিএনপির সংসদ সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেননি।
বিএনপির নেতারা বলছেন, বিষয়টি যেহেতু সংবিধানের এখতিয়ারের বাইরে তাই সংসদে সংশোধনীর প্রস্তাব এনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে বিরোধী জোটের নেতারা মনে করছেন, এটি মূলত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার একটি পরীক্ষা।
এনসিপির সদস্য সচিব ও দলটির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ‘সংসদের প্রথম দিনেই সরকারি দলের আচরণ ও বক্তব্যে বোঝা যাবে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে এগোতে চায় কি না। যদি সরকার সেই পথে না হাঁটে, তাহলে বিরোধী দল সংসদে এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানাবে। এখানে সংবিধানের কথা বললে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে টান পড়বে।’
তাদের মতে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে মূলত জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে যে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তিতেই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই সেই সনদ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গড়িমসি হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।
সংসদের প্রথম দিনেই আরও কয়েকটি ইস্যুতে সরব হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী জোট। এর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদে দেওয়া ভাষণ। সংসদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া হলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে বিরোধী দল।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খলিলুর রহমানকে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি তুলতে পারে বিরোধী দল। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ- তা নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলা হতে পারে।
তবে সবকিছুর মধ্যেও সংসদের পরিবেশ নিয়ে পুরোপুরি সংঘাতমুখী অবস্থান নিতে চায় না বিরোধী জোট।
গতকাল (মঙ্গলবার) জাতীয় সংসদের সরকারি দলের চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ সচিবালয় থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন- মো. রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মো. আবুল হাসনাত এমপি ও মো. নূরুল ইসলাম এমপি। এ সময় উভয়পক্ষ জাতীয় স্বার্থে সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও গতিশীল এবং অংশগ্রহণমূলক করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে একটি ‘ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এ সময় সরকারি দলের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে সরকার গঠন করেছে, সেখানে সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি সংসদকে আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই বৈঠকে সংসদকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার বিষয়ে উভয় পক্ষই মত দিয়েছেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও কীভাবে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য তৈরি করা যায়- সেই বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলেই নতুন বাংলাদেশ গঠনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সংসদকে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন দুই পক্ষের নেতারা।
বিরোধী জোটের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সরকার যদি সংস্কার প্রশ্নে ইতিবাচক ভূমিকা নেয় এবং ঐকমত্য তৈরির উদ্যোগ দেখায়, তাহলে সংসদের শুরুতেই কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করতে চায় না তারা। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হলে বিরোধী দল সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।
এদিকে, সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদে একজনের নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথাও ভাবছে জামায়াত।
বিকেপি/এমএইচএস

