Logo

জাতীয়

স্বস্তিতে ফিরছে জনজীবন: পাম্পে তেলের দীর্ঘ লাইন উধাও

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৩

স্বস্তিতে ফিরছে জনজীবন: পাম্পে তেলের দীর্ঘ লাইন উধাও

রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে গত কয়েক মাস ধরে চলা জ্বালানি তেলের সেই পরিচিত দীর্ঘ লাইন এখন অনেকটাই উধাও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে বা রাতের পর রাত জেগে তেলের জন্য অপেক্ষার যে দুঃসহ চিত্র নগরবাসী দেখেছে, তাতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। সরকারের ডিজিটাল ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থার প্রবর্তন, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণের পর সোমবার রাজধানীর অধিকাংশ পাম্পে ফিরেছে শৃঙ্খলা ও স্বস্তি।

সরেজমিনে দেখা যায়, শাহবাগ, তেজগাঁও, নিকুঞ্জ ও ধানমন্ডি এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখন আর যানবাহনের জটলা নেই। তেলের জন্য অপেক্ষার সময় ১০ ঘণ্টা থেকে কমে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ মিনিটে নেমে এসেছে।

গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক আনিসুর রহমান গত সপ্তাহেও তেজগাঁওয়ের একটি পাম্পে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিয়েছিলেন। সোমবার বিকেলে নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টারে তেল নিতে এসে তার অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তিনি বলেন, আজ (সোমবার) আধা ঘণ্টার মতো হয়েছে এসেছি। লাইন ছোট হওয়ায় এখনই তেল পেয়ে যাব মনে হচ্ছে। জীবনের প্রথম তেলের জন্য ১০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই দুঃস্বপ্ন এখন কাটছে বলে মনে হয়।” একই চিত্র দেখা গেছে রাইডার তরিকুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। তেলের সংকটের কারণে ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। এখন পরিস্থিতির উন্নতি দেখে আবারও কাজে ফেরার সাহস পাচ্ছেন। তরিকুল বলেন, আগে তিন ঘণ্টা লাগত, আজ ৫-১০ মিনিটেই পাম্পের কাছে পৌঁছে গেছি। এমন অবস্থা থাকলে আমাদের কষ্ট দূর হবে।”

জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে কিউআর কোডভিত্তিক ফুয়েল পাস বিডি’ সিস্টেমকে। গত ৯ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেলের জন্য এটি চালু হলেও, ২৬ এপ্রিল থেকে ব্যক্তিগত গাড়ির (কার) জন্য ফুয়েল পাস উন্মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর ১৮টি প্রধান পাম্পসহ ঢাকার ১১টি পাম্পে এই সিস্টেমের মাধ্যমে তেল বিতরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন গ্রাহক কতটুকু তেল নিচ্ছেন তার সঠিক রেকর্ড থাকছে, যা কৃত্রিম সংকট ও তেলের অবৈধ মজুত রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী জানান, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখায় আমরা সফলতা পেয়েছি। কয়েকদিন আগেও যে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে মাইলের পর মাইল লাইন ছিল, এখন সেখানে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তেল পাওয়া যাচ্ছে।”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় দাম বাড়ানো হয়নি। তবে গত ১৮ ও ১৯ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে। নতুন দাম অনুযায়ী ডিজেল লিটার প্রতি ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন: ১৩০ টাকা। দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার তেলের সরবরাহ ২০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। এতে বাজারে তেলের সহজলভ্যতা বাড়ে এবং ভোক্তাদের মধ্যে থাকা আতঙ্কিত ক্রয়’ কমে আসে। পাম্প মালিকরা জানান, মানুষ আগে এক সাথে ফুল ট্যাংকি তেল কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত, যা এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে।

এক সপ্তাহ আগে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের লাইন জাহাঙ্গীর গেট ছাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে যেত। সোমবার বিকেলে সেখানে দেখা যায়, লাইন অনেক ছোট হয়ে বিমানবাহিনীর মেস পর্যন্ত এসেছে। রামপুরা থেকে আসা মোটরসাইকেল চালক রাকিবুল ইসলাম জানান, আগে যেখানে ৩ ঘণ্টা লাগত, আজ মাত্র এক ঘণ্টায় তিনি তেল পেয়েছেন।

নীলক্ষেত ফিলিং স্টেশনে থাকা লালবাগের বাসিন্দা আবু মিয়া বলেন, গত সপ্তাহে ৭-৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ৫শ টাকার তেল পেয়েছিলাম। আজ ৫ মিনিটে প্রয়োজনীয় তেল নিয়ে বের হচ্ছি, বিশ্বাসই হচ্ছে না।” লাইন ছোট হলেও পাম্প মালিকদের কেউ কেউ মনে করছেন সরবরাহ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, অকটেনের সমস্যা অনেকটা কেটে গেছে। তবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কল-কারখানায় জেনারেটর চালাতে ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে। তাই ডিজেলের সরবরাহ আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।” এদিকে, অনেক হারভেস্টার ও পাওয়ার থ্রেসার মালিকরা অভিযোগ করেছেন যে, হাওরাঞ্চলে ধান কাটার এই মৌসুমে ডিজেলের সরবরাহ কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। সরকার রেশনিংয়ের মাধ্যমে তেল দিলেও চাহিদা অনুযায়ী তা পর্যাপ্ত নয় বলে মাঠ পর্যায়ের খবর পাওয়া গেছে।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে সব ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও পর্যায়ক্রমে সব যানবাহনের জন্য ডিজিটাল ফুয়েল পাস বাধ্যতামূলক। কিউআর কোড ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলে জ্বালানি সরবরাহ করা যাবে না। এই নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বা অপারেটরের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী মে মাসেও জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিয়মিত আমদানি প্রক্রিয়া সচল রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন