অলোক আচার্য, সংগৃহীত
বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে। এই খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির কারণ হিসেবে সামনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোটা দাগে এই দুটি সবচেয়ে বড়ো কারণ খাদ্য সংকটের। এরপর দেশগুলোর আন্তঃকলহ, সরবরাহ চেইন, অসাধু কারবার এবং বণ্টন ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিকে খাদ্য সংকটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। বিশ্বজুড়ে তীব্র গরম অর্থাৎ তাপদাহ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি বলছে, অতিরিক্ত গরমে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারছেন না, গবাদিপশু তীব্র চাপের মুখে পড়ছে ও ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, ফলে এক বিলিয়নের বা ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয় ভাগেই ক্রমবর্ধমান তীব্র ও ঘন ঘন তাপপ্রবাহ কিছু অঞ্চলের খাদ্য সরবরাহকে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। এই তথ্য উঠে এসেছে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার যৌথভাবে প্রস্তুত করা এক বড় প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উষ্ণ অঞ্চলগুলোতে কৃষকদের জন্য বছরে ২৫০ দিন পর্যন্ত নিরাপদে বাইরে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ বছরের দুই-তৃতীয়াংশ সময়ই তারা কাজ করতে পারবেন না। এমন অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে- ভারতের বড় অংশসহ দক্ষিণ এশিয়া, উষ্ণমণ্ডলীয় সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকা। গবাদিপশুর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থেকেই সাধারণ প্রাণীদের ওপর তাপজনিত চাপ শুরু হয়, ফলে মৃত্যুহার বাড়ছে। অধিকাংশ কৃষিজ ফসলের উৎপাদন ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় কমতে শুরু করে। এতে কোষের দেয়াল দুর্বল হয়ে যায় ও বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হতে পারে। কিছু অঞ্চলে ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। গমের উৎপাদনও প্রায় একই হারে কমেছে এবং তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়লে তা আরও কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় বিশ্বে আমাদের দেশের অবস্থানও বেশ সংকটজনক। ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বিশ্বে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে এবারও সংঘাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে জাতিসংঘ-সমর্থিত ওই প্রতিবেদনে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের পূর্বাভাসও বেশ অন্ধকার ও উদ্বেগজনক। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের বসবাসের তালিকায় শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। গত বছর বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই ওই ১০ দেশে বসবাস করে। চলতি বছরও এসব দেশে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। এতে সতর্ক করা হয়েছে সংঘাত ও চরম আবহাওয়ার কারণে অনেক দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তা বর্তমানে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন এই ১০ দেশে ঘনীভূত রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার ও জিম্বাবুয়েতে পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় সেই সাফল্য প্রায় মøান হয়ে গেছে। একটি টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো দেশের জন্যই প্রধান চ্যালেঞ্জিং বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা এবং দেশগুলো সমন্বিতভাবে এ সমস্যা মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে কারণ পৃথিবীতে বহু নারী-পুরুষ ও শিশু অভুক্ত অবস্থায় ঘুমাতে যাচ্ছে। এই সমস্যা আমাদের আগেও ছিল কিন্তু সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে। যুদ্ধ সবাই শেষ চাইলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো লক্ষণ নেই বিপরীতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বৃদ্ধি পেয়েছে সরবরাহ খরচ। সবদিক থেকে ফসল উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অনেক দেশেই বেড়েছে খাদ্য পণ্যের দাম।
আফ্রিকার দেশগুলোতে খাদ্যসংকট তীব্র হচ্ছে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি বাড়ায় উন্নত দেশগুলোতেও খাদ্যপণ্যের মূল্য রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানা যায়, জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি লিন্ডা টমাস গ্রিনফিল্ড এক তথ্যে জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে চরম খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে বিশ্বের চার কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে আফ্রিকার সাব সাহারা অঞ্চল। ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে তো মারাত্বক খাদ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ুর সাথে মানবসৃষ্ট পরিবেশ এর জন্য দায়ী। কম বৃষ্টিাতের ফলে নষ্ট হয়েছে সোমালিয়ার হাজার হাজার একর জমির ফসল। পানি ও খাদ্যশূন্য হয়ে মারা গেছে কৃষকদের গবাদিপশু। সম্প্রতি বিশ্বের দুই শতাধিক এনজিওর গবেষণা প্রতিবেদন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, বিশ্বে কেবল ক্ষুধার কারণেই প্রতি চার সেকেন্ডে একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিবৃতিতে এনজিওগুলো বলেছে, ৭৫টি দেশের বিভিন্ন সংগঠন আকাশচুম্বী ক্ষুধার মাত্রা এবং তা মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সুপারিশ নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। এতে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, আশ্চর্যজনক বিষয় হলো- বিশ্বের ৩৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এখন তীব্র ক্ষুধার্ত। আর ক্ষুধার্ত মানুষের এই সংখ্যা ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একুশ শতকে বিশ্বে আর দুর্ভিক্ষ ঘটবে না বলে বিশ্ব নেতারা প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও সোমালিয়ায় আরও একবার দুর্ভিক্ষ আসন্ন। বিশ্বের ৪৫টি দেশের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ অনাহারের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। বিশ্বের দুই শতাধিক এনজিও’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ জন মানুষ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছেন। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশ এবং এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও এই মন্দার পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও বিশ্বের নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় দেশে দেশে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম; যার বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খাদ্যমূল্যেও। বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক মার্চে ১২৮ দশমিক পাঁচ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির সংশোধিত স্তরের তুলনায় দুই দশমিক চার শতাংশ বেশি। দাম বৃদ্ধির এই ধারা চলছে টানা দুই মাস ধরে। শস্য, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, ভোজ্যতেল এবং চিনিসহ সব প্রধান পণ্যের দামই এ সময়ে বেড়েছে।
বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক অনুযায়ী, মার্চে খাদ্যশস্যের মূল্য সূচক মাসিক ভিত্তিতে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়ে ১১০ দশমিক চার পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে এবং বার্ষিক ভিত্তিতে বেড়েছে শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম আগের মাসের তুলনায় দুই দশমিক চার শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমাদের হাতে যুদ্ধ বন্ধ করার বিকল্প নেই। অধিকাংশ মানুষের হাতে তা কেনার মতো অর্থও থাকছে না। এটা একটি মানবিক বিপর্যয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই বিশ্ব একটি ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। যেখানে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর দারিদ্রতা একটি বড় সমস্যা। এই দারিদ্রতার কারণেই মূলত ক্রয়ক্ষমতা কমে এবং মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে। করোনার ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ দফায় দফায় লকডাউন থাকায় বন্ধ থেকেছে উৎপাদন কার্যক্রম। মানুষ কাজ হারিয়ে দরিদ্র হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে যখন ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা চলছিল সেই সময় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে এসেছে। একটি ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই আর একটি ধাক্কা মানুষের নাভিশ্বাস ফেলতে বাধ্য করছে। বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রতিদিনের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণের জীবনমান নিম্নমুখী হচ্ছে। আগামী কয়েকমাসে পৃথিবী একটি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হওয়ার মতো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর কারণ হলো প্রথমত করোনার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, করোনার শেষ হতে না হতেই রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং এর সাথে বহুদিন ধরে চলে আসা সমস্যাগুলো যেমন- বিভিন্ন দেশে দ্বন্দ্ব সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা এবং শরণার্থী সংকট। এখন এসব সমস্যা আরও বেশি তীব্র হওয়ার মুখে। কারণ বিভিন্ন দেশ খাদ্য সংকটের মুখে দাড়িয়ে। এর মধ্যে পৃথিবীজুড়েই তীব্র শরণার্থী সংকট চ্যালেঞ্জের মুখে দাড় করিয়েছে। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা দাড় করা কষ্টসাধ্য।
যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈষম্যের কারণে পৃথিবীতে দারিদ্রতা এবং খাদ্য সংকট তীব্র হচ্ছে। ভয়াবহভাবে দারিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসাথে পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সেটা সামাল দেয়া বিশ্বের জন্য চ্যালেঞ্জের। দারিদ্রতা, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, রিজার্ভ কমে যাওয়া, খাদ্যপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি, বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রভৃতি বিশ্ব অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ভোগাবে। যদিও এর সাথে প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন খরা, বন্যা ইত্যাদিও কম দায়ী নয়। টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি ঐক্যবদ্ধ পৃথিবী এই সময় অত্যন্ত জরুরি। আর তা সম্ভব না হলে সত্যি সত্যি এই পৃথিবীকে খাদ্য সংকটে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

