অলোক আচার্য, সংগৃহীত
শিক্ষা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সফলতা-ব্যর্থতা ঘুরপাক খাচ্ছে পাস এবং ফেলের মধ্যে। বস্তুত পাস এবং ফেলের বাইরেও কিছু কথা, কিছু প্রশ্ন এবং অসংখ্য জীবন থাকে। সেই হিসাব আমরা সাধারণত করছি না, আমরা কাগজে কলমের পরিসংখ্যান নিয়ে ছোটাছুটি করছি। যে প্রতিষ্ঠান থেকে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রথমে সেই প্রতিষ্ঠান নিয়ে যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হলো, আদতে দেখা গেলো অনেক শিক্ষার্থীকে জিপিএ-৫ স্ট্যান্ডার্ড না থাকার কারণে পরীক্ষার সুযোগই দেওয়া হয়নি। যারা জিপিএ-৫ পায় না অথবা পাওয়ার যোগ্য নয় তারা কি লেখাপড়া করবে না।
যাদের সন্তান জিপিএ-৫ পেয়েছে তারা বেশ গর্বের সঙ্গে ফেসবুকে পোস্ট করেছে নিজের সন্তানকে নিয়ে। যাদের সন্তান জিপিএ-৫ পায়নি তাদের সন্তানকে নিয়ে তেমন কোনো পোস্ট আমার চোখে পড়েনি! একজন অভিভাবককে শুধু দেখেছি পোস্ট দিতে। জিপিএ-৫ না পাওয়াটা কি সত্যিই এতটা লজ্জার, অপমানের! শিক্ষা এবং তার ফলাফল নিয়ে এই প্রতিযোগিতার মানসিকতা যা ক্রমেই অবনতি হচ্ছে সেটি আর কবে দূর হবে? রেজাল্ট খারাপ হলে যে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয় সেটিও এই অপমান থেকে সরে যেতেই।
ফেল মানেই চূড়ান্ত ব্যর্থতা আর জিপিএ-৫ মানেই জীবনে সফলতা! আসলেই তাই! কয়েকদিন আগে যে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে সেখানে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। গত ১৯ বছরের মধ্যে এটা খারাপ ফল। যদি এর বিপরীত হতো মানে ফের করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুব কম হতো, পাসের হারে রেকর্ড হতো তাহলে কি খুব ভালো হতো? পাসের হারের সঙ্গে সঙ্গে পড়ালেখার মান বৃদ্ধি অতি আবশ্যক। যদি সেটা না হয় এবং ক্রমাগতভাবে পড়ালেখার মান কমতে থাকে এবং বিপরীতে পাসের হার বাড়তে থাকে তাহলে চাকরির বাজারে কিছু বেকার বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো কাজই হবে না। আমাদের সত্যিই শিক্ষিত এবং দক্ষ মানুষ দরকার যা কোয়ালিটি এডুকেশন থেকেই সম্ভব। আর এই যে যারা ফেল করেছে ওরাও তো অনেক মেধাবী। যদি মেধার সংজ্ঞা হিসেবে ধরি তাহলে এদের প্রত্যেকেরই ভবিষ্যত রয়েছে যা আমাদের সামনে আনতে হবে। আরও সুযোগ রয়েছে পরীক্ষা দেবার।
ফেল করেছে, ফেল করেছে বলে কানের তালা নষ্ট করার কোনো দরকার নেই। যদি ফেইলিওর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস- এই কথা আমরা সত্যি ধরি তাহলে আপাতদৃষ্টিতে ফেলটাকে বড়ো করে না ধরে এই বাইরে যে জীবন রয়েছে সেখানে ফোকাস করা দরকার। পাস এবং ফেলের বাইরেও জীবন থাকে, দক্ষতা থাকে। আমরা শুধু পরে থাকি পরিসংখ্যান নিয়ে। এখানেই আমাদের দুর্বলতা। যারা ফেল করেছে তারা কেন ফেল করেছে, কোন সাবজেক্টে ফেল করেছে, কোথায় দুর্বলতা ছিল, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কী ধরনের সমস্যা রয়েছে সবকিছু সূচারুরূপে প্রত্যক্ষ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেই সফলতা আসবে। ফেল থেকে পাস করানো খুব বেশি কঠিন কাজ নয় যতটা কঠিন এইসব ছেলেমেয়েদের দক্ষ করে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
আমাদের ফোকাস যদি কেবল পাস এবং ফেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে ভবিষ্যতে আরও বিপদ অপেক্ষা করছে। আমাদের দেশের শিক্ষা গ্রহণের প্রেক্ষাপটে ছাত্রছাত্রীদের আলাদা করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর। এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে পাস ও ফেল। পাস যারা করছে তারা তো হাতে চাঁদ পেয়েছে আর যারা পাস করতে পারছে না তারা অন্ধকারের কোণায় অন্তত কয়েকটা দিন কাটাবে। একজন শিক্ষার্থী প্রাক প্রাথমিক শ্রেণি থেকে শুরু করে দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তারপর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এখন শুধু এসএসসি পরীক্ষায় কোনো কারণে অকৃতকার্য বা ফেল করলেই তার পিছনের পাসের ইতিহাসগুলো মুছে যাবে। কি আশ্চর্য ধরাবাধা নিয়ম! সবে মাত্র এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। কোন বোর্ডে কতজন পাস করলো সেটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশ ফেলের হিসাব নেওয়া হচ্ছে। পাসের হার ছেলে না মেয়েদের বেশি তাও নির্ণয় করা হয়েছে। সার্বিকভাবে পাসের হার কমে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর তুলনায় শিক্ষক বেশি রয়েছেন! সেখানেও কাউকে পাস করাতে পারেননি সেসব শিক্ষকরা!
প্রশ্ন হলো কত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে সত্যিই শিক্ষকের দরকার। অথচ সেখানে শিক্ষক সংকট। যাই হোক, ফেল করে সামাজিক অবস্থায় তাদের লজ্জাস্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফেল করে আত্মহত্যার খবরও আসছে। যদি এভাবে মূল্যায়ন করা হয় যে একটা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস সিক্সে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কতজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে তাহলেই বেড়িয়ে আসবে কতজন শিক্ষার্থীর জীবন মাঝ থেকে ঝরে গেছে। এইসব ঝরে যাওয়া শিক্ষার্থীরা কেন ঝরে গেছে সেই কারণও খুঁজে বের করতে হবে। আবার যে শিক্ষার্থী ক্লাস সিক্স থেকে পাস করতে করতে ক্লাস টেনে উঠলো সে যদি এসএসসিতে কোনো কারণে ফেল করেও বসে তাহলে বিগত দশ বছরের পাসের কোনো মূল্যই আমরা দিতে পারছি না।
এভাবে গড়ে উঠেছে পুরো সিস্টেম। পাস করলেই মিষ্টি কেন! এক ছাত্র তো আবার আই ফোনও চেয়ে বসেছে! পাসের যে এত মহিমা আগে জানা ছিল না। বিষ্ময়কর ব্যাপার! জিপিএ ফাইভ না পেলেই আত্মহত্যা করতে হবে? কিন্তু কেন? আত্মহত্যা কেন? একবার ফেল বা জিপিএ ফাইভ না পেলেই কি জীবনের সব শেষ হয়ে যায়? এত তুচ্ছ এ জীবন। যারা পাস করতে পারেনি তাদের প্রতি আমার তেমন মন খারাপ নেই। এটা ঠিক যে পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল একটা ভালো ফলাফল করা। সেটা না হলে মন খারাপ হওয়ারই কথা। কিন্তু তার থেকেও আমার মনে আশঙ্কা থাকে প্রায় প্রতিবারই এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর কারও কারও আত্মহননের খবর পত্রিকায় পড়তে হয়। এটা সত্যি অত্যন্ত দুঃখজনক। জীবনটা তো অনেক বড়। সমস্যাটা হলো ফল প্রকাশের পর অনেক অভিভাবকও সহানুভূতি সম্পূর্ণ আচরণ করে না বলেই আমার মনে হয়।
এমনকি তার প্রতিবেশি ও আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকেও তার জন্য বিরূপ আচরণ হয়ে থাকে। এই যে গণিত ও ইংরেজি বিষয়কে দায়ী করা হচ্ছে সেখানে ফোকাস করতে হবে। গণিত ও ইংরেজি শিক্ষকদের ঘাটতি সবার আগে খুঁজে বের করতে হবে। কোন পদ্ধতিতে শেখানো হচ্ছে বা আদৌ ক্লাসে ঠিকঠাক গণিত শেখানো হচ্ছে কি না সেটিও বের করা দরকার। নাকি শিক্ষক মহোদয়রা কেবল প্রাইভেট আর কোচিং নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন সেটির খোঁজ নেওয়া জরুরি। গণিতকে কঠিন করে তুলছেন কিন্তু এই শিক্ষকরাই। আবার সহজও করছেন তারা। গণিতকে কীভাবে আরও সাবলীল করে তোলা যায় তার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সঙ্গে ইংরেজির ঘাটতিও দূর করতে হবে।
আমরা প্রতিযোগিতার নামে এক ধরনের অসুস্থতা তৈরি করেছি। প্রতিযোগিতা ভালো। তবে তা জীবনের বিনিময়ে অবশ্যই নয়। ফল খারাপ হয়েছে তবে ভালো করার সুযোগও তো আছে। পরীক্ষা মানে পাশ আর ফেল। যারা পাশ করছে তারা নিঃসন্দেহে মেধাবী। কিন্তু যারা পাশ করছে না তারা কি মেধাশূন্য? কোনো একটা বা দুইটা বিষয়ে ফেল করলেই কি তার মেধা নেই বলা যেতে পারে? শুধু ফলাফল দিয়ে নিশ্চয়ই কোনো ছাত্রছাত্রীর মেধা পরীক্ষা করা যায় না। কারণ স্কুল কলেজের পাশ ফেল শুধু সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে স্কুলে ছাত্র হিসেবে খুব খারাপ হয়ে পরবর্তী জীবনে বড় বড় ব্যক্তিদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন। এবং এই সংখ্যাটা কিন্তু কম নয়। অনেক দূরের উদাহরণ না দিই।
আমাদের দেশেই মাঝে মধ্যেই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় কোনো গ্যারেজের মিস্ত্রী বা ইলেকট্রিক মিস্ত্রী অথবা কোনো ডিপ্লোমা পাস ছাত্র কোনো গাড়ি বা হেলিকপ্টার তৈরি করেছেন। সেসব দিয়ে তারা রাস্তায় চালাচ্ছেনও। মাঝে মধ্যেই কিন্তু এসব খবর আমরা পাই। অথচ দেখবেন এই যে আমরা প্রযুক্তিতে যাদের সবচেয়ে মেধাবী বলছি সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে দেশে থেকে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার তারা করতে পেরেছেন? দেশকে তারা কী দিয়েছেন? যদি তাই হতো তাহলে স্বাধীনতার পর থেকে এই এত বছরে আমরা নাম করা দু’একজন বিজ্ঞানী পেতাম! তাহলে পাশ ফেল এবং মেধা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হলেও স¤পূর্ণ নির্ভর নয়। আর ফেল করার দায় কিন্তু একা ছাত্রছাত্রীর কাঁধে বর্তায় না। শিক্ষকও এর জন্য সমান দায়ী। আর এর জন্য পুরো সিস্টেমটাই দায়ী। অভিভাবকগণও দায়ী। আপনার সন্তান সন্ধ্যার পর যখন বাড়ি না ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে মোবাইলে সময় কাটিয়েছে তখন খোঁজ নেননি। যখন সারাদিনের একটি বড়ো অংশ গেমস খেলেছে তখনও খোঁজ নেননি। শুধু ফল খারাপ হওয়ার পর খোঁজ নিতে যাচ্ছেন! একটু দেখুন এবার আপনার সন্তান কত সময় বইয়ের সঙ্গে কাটায়, প্রতিদিন স্কুলে যায় কি না ইত্যাদি।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

