Logo

রাজনীতি

বিশ্ববাজারে সোনার দামে রেকর্ড: ভরসা গোল্ড-প্লেটেড গয়না

Icon

বিজনেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১:০৮

বিশ্ববাজারে সোনার দামে রেকর্ড: ভরসা গোল্ড-প্লেটেড গয়না

গোল্ড-প্লেটেড গয়না

দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে বিয়ে মানেই সোনার গয়নার ঝলকানি। কিন্তু বর্তমানে সোনার বিশ্ববাজার যে অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে সাধারণ পরিবারের পক্ষে খাঁটি সোনার গয়না কেনা অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আভিজাত্য ধরে রাখতে এবং সামাজিক চাপ সামাল দিতে দক্ষিণ এশিয়ার কনেরা এখন ব্যাপকভাবে ঝুঁকছেন কৃত্রিম বা গোল্ড-প্লেটেড গয়নার দিকে। বিশেষ করে 'ওয়ান গ্রাম গোল্ড' বা এক গ্রামের সোনার প্রলেপ দেওয়া গয়না এখন বিয়ের বাজারের নতুন লাইফসেভার’।

২০২৬ সালের শুরু থেকেই সোনার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে সব রেকর্ড ভেঙেছে। গত ২৯ জানুয়ারি প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫,৫৯৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। বর্তমানে ভারতের বাজারে ১০ গ্রাম সোনার দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬৩ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশেও ২২ ক্যারেট সোনার ভরি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানিয়েছে, উচ্চমূল্যের কারণে ২০২৫ সালে ভারতে সোনার গয়নার চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

কাশ্মীরের শ্রীনগরের বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী উজমা বশির (ছদ্মনাম), যিনি পেশায় একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট। আগামী গ্রীষ্মে তার বিয়ে। উজমা জানান, "কাশ্মীরে সোনা শুধু গয়না নয়, এটি নারীর মর্যাদা। শ্বশুরবাড়িতে একজন কনেকে কতটা মূল্যায়ন করা হবে, তা প্রায়ই নির্ধারিত হয় তার সোনার পরিমাণের ওপর।" মাসে ১০০ ডলারের কম আয় করা উজমার পক্ষে কয়েক ভরি সোনা কেনা অসম্ভব। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন ওয়ান গ্রাম গোল্ড’ গয়না। তিনি বলেন, "এটি দেখতে একদম আসল সোনার মতো। বিয়ের দিনে কেউ আঙুল তুলে কথা বলতে পারবে না।"

নয়াদিল্লির লক্ষ্মী নগরের বাসিন্দা পাঁচ সন্তানের জননী ফাতিমা বেগম জানান, ১৯৯৬ সালে তার বিয়ের সময় বাবা তাকে ৬০ গ্রাম সোনা দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ তিনি তার মেয়ের জন্য তার অর্ধেকও কিনতে পারছেন না। আভিজাত্য রক্ষায় তিনি মেয়ের পুরনো কিছু সোনার সাথে ওয়ান গ্রাম সোনার সেট মিলিয়ে দিয়েছেন যাতে বিয়ের আসরে মেয়েকে লজ্জিত হতে না হয়।

বাংলাদেশেও চিত্রটি অভিন্ন। ঢাকার চকবাজারের পাইকারি বাজারে এখন উপচে পড়া ভিড় ইমিটেশন বা কৃত্রিম গয়নার দোকানে। হজি সেলিম টাওয়ারের একজন দোকানি জানান, সোনার দাম বাড়ার পর থেকে তাদের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে। ছোট দুল ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও বড় ব্রাইডাল সেট পাওয়া যাচ্ছে কয়েক হাজার টাকায়।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা সাদিয়া ইসলাম জানান, "আগের মতো সোনা পরা এখন আর নিরাপদও নয়। চুরি বা ছিনতাইয়ের ভয় তো আছেই, তার ওপর এত দামি জিনিস কেনার সামর্থ্যও সবার নেই। এখন আমরা পোশাকের সাথে মিলিয়ে ইমিটেশন গয়নাই বেশি পছন্দ করি।"

পাকিস্তানে সোনার দাম বর্তমানে আকাশচুম্বী। সেখানে এক তোলা (১১.৬৬ গ্রাম) সোনার দাম প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি ছাড়িয়েছে। করাচির বাসিন্দা আয়েশা খান জানান, "পাকিস্তানে এখন খাঁটি সোনা শুধু ধনকুবেরদের বিলাসিতা। সাধারণ মানুষ এখন ১৮ ক্যারেট বা ১২ ক্যারেট কিংবা গোল্ড-প্লেটেড গয়নার দিকে ঝুঁকছে।" একটি আসল সোনার ব্রাইডাল সেটের দাম যেখানে কয়েক লাখ বা কোটি রুপি হতে পারে, সেখানে গোল্ড-প্লেটেড সেট পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০ থেকে ৬০ হাজার রুপির মধ্যে।

গয়নার এই উচ্চমূল্য সমাজ জীবনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শ্রীনগরের ৪০ বছর বয়সী রিহানা আশরাফ জানান, যৌতুক হিসেবে সোনা দিতে না পারায় তার একাধিক বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে গেছে। কেবল শ্রীনগরেই প্রায় ৫০ হাজার নারী রয়েছেন যারা আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সোনার গয়নার দাবি মেটাতে না পেরে বিয়ের বয়স পার করে ফেলেছেন।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সোনার এই উচ্চমূল্য দক্ষিণ এশীয় নারীদের গয়না পরার ধরনে আমূল পরিবর্তন আনছে। এখন মানুষ সোনাকে অলঙ্কারের চেয়ে বিনিয়োগ’ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিয়েতে পরার জন্য কৃত্রিম গয়না এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য অল্প কিছু সোনার বার বা কয়েন জমানোর প্রবণতা বাড়ছে।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন