রোজা ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত হলেও এর শারীরিক উপকারিতাও রয়েছে। এটি আজ বিজ্ঞানের আলোকেও প্রমাণিত। রোজা রেখে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। এই দীর্ঘ বিরতি দেহকে করে তোলে সতেজ ও রোগমুক্ত।
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীর তার সংগৃহীত চর্বি ভেঙে শক্তি উৎপাদন শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কিটোসিস। এতে শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরে যায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও রোজা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে বলে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে।
হৃদরোগ প্রতিরোধে রোজা: রোজার সময় দেহের ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃত কোষগুলো ভেঙে নতুন কোষ তৈরি হয়। এই প্রাকৃতিক পুনর্র্নিমাণ প্রক্রিয়া রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। রোজায় রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা কমে এবং উপকারী কোলেস্টেরল (এইচডিএল) বাড়ে। রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রোজা পালনকারীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা: সারা বছর অবিরাম খাবার হজম করতে করতে পাকস্থলী ও অন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রোজার সময় পাচনতন্ত্র পূর্ণ বিশ্রাম পায়। এতে হজমশক্তি উন্নত হয়, গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের সমস্যা কমে এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। রোজা শ্বেত রক্তকণিকার উৎপাদন বাড়ায় এবং শরীরের প্রদাহ কমায়। ফলে সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়।
রোজা মানসিক চাপ কমাতেও সহায়ক। এই সময় মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও এন্ডোরফিনের নিঃসরণ বাড়ে, যা মেজাজ ভালো রাখে। পাশাপাশি ইচ্ছাশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ দৃঢ় হয়, যা মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
হাদিসে রোজার উপকারিতা: এ তো গেল আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা। আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে, যখন পৃথিবীতে আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখনই নবীজি (সা.) রোজা রাখলে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার কথা বলেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা রাখো, সুস্থ থাকবে।’ (মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৮৩১২) নবীজির এই বাণী আজ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে প্রমাণিত।
খাবার গ্রহণে পরিমিতিবোধ: রোজা হলো অল্প খাওয়ার ট্রেনিং। রোজা ছাড়াও অতিরিক্ত খাবার গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে ইসলাম। খাবারের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত আহার শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বহু রোগেরও মূল কারণ অতিভোজন। নবীজি (সা.) খাদ্যগ্রহণের একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। মিকদাম ইবনে মাদি কারিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দেহের শক্তি জোগায় এমন কয়েক লোকমা খাবারই মানুষের জন্য যথেষ্ট। অবশ্য অধিক যদি খেতেই হয়, তাহলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার দিয়ে, এক-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূর্ণ করবে। আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
সুস্থ থাকার মন্ত্র: বাঁচার জন্য খাদ্য দরকার, এটা যেমন বাস্তব; অতিরিক্ত খাদ্য রোগের ভাণ্ডার, এটাও সত্য। নবীজির জীবনী গ্রন্থে একটা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, মিশরের সম্রাট মুকাওকিস মুসলমানদের চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসক পাঠান। নবীজি (সা.) এই বলে চিকিৎসককে বিদায় করে দেন যে, ‘আমরা এমন জাতি, যারা ক্ষুধা না লাগলে খাই না। আবার খেলেও পেটে কিছুটা ক্ষুধা রেখেই উঠে পড়ি। সুতরাং আমাদের চিকিৎসক প্রয়োজন নেই।’ (সিলসিলায়ে সহিহা: হাদিস: ১৬৫১)
রোজা মানবদেহের জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। নিয়মিত রোজা পালনের মাধ্যমে শরীরের বিপাকক্রিয়া উন্নত হয়, রক্তে শর্করা ও চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং শরীর থেকে ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ দূর হয়। এটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শক্তিও বৃদ্ধি পায়। আধুনিক বিজ্ঞানও রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারিতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। সুতরাং, সুষ্ঠু নিয়ম মেনে রোজা পালন করলে তা মানবদেহকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

