রমজান মাস মানেই সংযম, আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার অনুশীলন। এ মাসে ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করে মানুষ নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, দরিদ্রের কষ্ট অনুভব করে এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে—ইফতার মাহফিল কি সত্যিই ইবাদতের অংশ হিসেবে মানবিক ও আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করছে, নাকি তা ধীরে ধীরে অপচয় ও প্রদর্শনীর সংস্কৃতিতে রূপ নিচ্ছে?
রোজাদারকে ইফতার করানো নিঃসন্দেহে একটি মহৎ আমল। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। এই শিক্ষাই আমাদের সমাজে ইফতার মাহফিলের প্রচলন ঘটিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-অনেক ক্ষেত্রে ইফতার এখন আর সাদামাটা খেজুর, পানি ও সামান্য খাবারে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা পরিণত হয়েছে বাহারি পদ, বিলাসবহুল আয়োজন এবং সামাজিক প্রতিযোগিতার এক মঞ্চে।
রমজানের মূল শিক্ষা হলো সংযম ও সরলতা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করতেন। তাঁর জীবনে ছিল না বাহুল্য, ছিল না আড়ম্বর। অথচ আমরা দেখি, অনেক ইফতার মাহফিলে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার পরিবেশন করা হয়, যার একটি বড় অংশ অপচয় হয়। রমজানে যেখানে দরিদ্র মানুষের জন্য সহমর্মিতা বাড়ার কথা, সেখানে খাদ্যের অপচয় নিঃসন্দেহে সেই চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক, করপোরেট বা সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত কিছু ইফতার মাহফিল আজ যেন আত্মপ্রচারের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, কে কত বড় আয়োজন করল- এসব বিষয় কখনো কখনো ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ফেলে। ফলে প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইফতার করাচ্ছি, নাকি মানুষের প্রশংসা অর্জনের জন্য?
তবে সব ইফতার মাহফিলকে একই পাল্লায় মাপা উচিত নয়। অনেক জায়গায় মসজিদভিত্তিক বা মহল্লাভিত্তিক ইফতার আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়। যেখানে পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, ছাত্র ও অসচ্ছল রোজাদাররা সম্মানের সঙ্গে ইফতার করতে পারেন। এমন উদ্যোগ রমজানের প্রকৃত চেতনা-ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও সহমর্মিতাকে ধারণ করে।
আমাদের ভাবতে হবে- রমজানে একটি বিলাসবহুল ইফতার পার্টির পেছনে যে অর্থ ব্যয় করছি, তার একটি অংশ যদি এতিমখানা, মাদরাসা, হাসপাতাল বা দরিদ্র পরিবারের হাতে তুলে দিই, তাহলে কি তা অধিক কল্যাণকর হবে না? হয়তো কম আয়োজনেও বেশি বরকত মিলতে পারে, যদি তাতে থাকে ইখলাস ও সত্যিকারের মানবতা।
সংযম মানে কেবল দিনের বেলা না খেয়ে থাকা নয়; বরং জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা। রমজান আমাদের শেখায়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ থেকে দূরে থাকতে। তাই ইফতার মাহফিল আয়োজন করতেই হলে তা হোক সরল, অপচয়মুক্ত এবং দরিদ্রবান্ধব। অতিরিক্ত খাবার নষ্ট না করে সঠিকভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিমিত আয়োজন করা যেতে পারে।
আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আমরা কি রমজানের চেতনাকে ধারণ করছি, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করছি? ইফতার মাহফিল যদি আমাদের হৃদয়ে তাকওয়া জাগ্রত করে, সমাজে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে এবং অভাবীদের মুখে হাসি ফোটায়- তবেই তা সার্থক। অন্যথায় তা কেবল আয়োজন, যার ভেতরে সংযমের বার্তা হারিয়ে যায়।
রমজান আমাদের সামনে এক আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় নিজেদের দেখার সাহস থাকতে হবে। ইফতার হোক ইবাদত, অপচয় নয়; সংযমের চর্চা, প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়। তাহলেই রমজান আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সত্যিকার পরিবর্তন বয়ে আনতে সক্ষম হবে। ইনশাআল্লাহ।
লেখক : পরিচালক, মাদরাসাতুত দাওয়াহ শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।
বিকেপি/এমএম

