Logo

ধর্ম

আধুনিক বিশ্বে ইসলামী শিক্ষার অপরিহার্যতা

Icon

​ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৮

আধুনিক বিশ্বে ইসলামী শিক্ষার অপরিহার্যতা

​মানবজীবনে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি মানুষের আত্মিক, নৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নকে একসঙ্গে সাধন করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। নবীজি (সা.) প্রয়োজনীয় ইসলামী জ্ঞান অর্জনকে ফরজ সাব্যস্ত করেছেন। হজরত হোসাইন ইবনে আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’ (মুজামুল আওসাত, হাদিস: ২০৩০)।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তির বিস্তার, গ্লোবালাইজেশন, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং মূল্যবোধের রূপান্তর মানুষের চিন্তাচেতনা ও জীবনধারায় গভীর প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এটি মানুষকে নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।

​ইসলামী শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য

​ইসলামী শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করা; তাকে আল্লাহভীরু, সৎ ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলা। কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা মানুষকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে এবং সঠিক পথে পরিচালিত করে। ইসলামী শিক্ষা দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখায়। এটি মানুষকে পার্থিব সফলতার পাশাপাশি চিরস্থায়ী মুক্তির জন্যও প্রস্তুত করে। ফলে একজন শিক্ষার্থী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে শেখে এবং পার্থিব ধনসম্পদের লোভে নিজের নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দেয় না।

​সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ

​বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে বস্তুবাদিতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এখানে সাফল্যের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় অর্থ, পদমর্যাদা ও ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে। এর ফলে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ক্রমশ অবহেলিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করলেও তা জীবনের সঠিক ব্যবহারে ব্যর্থ হচ্ছে। অপরদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে সমাজে অপরাধ, অসততা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামী শিক্ষার বিকল্প নেই, কারণ এটি জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটায়।

​আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলাম

​অনেকে মনে করেন, ইসলামী শিক্ষা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিপন্থী; এটি নিতান্তই ভুল ধারণা। বাস্তবতা হলো, ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআনের প্রথম শব্দই হলো ‘ইকরা’—পড়ো। ইসলামী শিক্ষা তো বটেই, নিয়ত ঠিক থাকলে পার্থিব জ্ঞান অর্জনও ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগে মুসলিম মনীষীরা চিকিৎসা, গণিত, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাই ইসলামী শিক্ষা কখনোই বিজ্ঞানবিরোধী হতে পারে না; এটি বরং জ্ঞানকে সঠিক পথে ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়। সমকালীন বাস্তবতায় প্রয়োজন এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ধর্মীয় ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় ঘটবে।

​আধুনিক প্রযুক্তি ও ইসলামী শিক্ষা

​বর্তমান যুগ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই প্রযুক্তিকে ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অনলাইন ক্লাস, ইসলামিক লেকচার, ডিজিটাল কোরআন শিক্ষা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দাওয়াহ কার্যক্রম আজ অনেক সহজ হয়েছে। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা ও নৈতিকতা শেখানো জরুরি।

​নৈতিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠন

​ইসলামী শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হলো উন্নত চরিত্র গঠন। একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য তার খোদাভীতি, আখলাক-চরিত্র ও নীতিনৈতিকতায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানবসম্প্রদায়! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সে-ই সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে সর্বাপেক্ষা মুত্তাকি।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দান করার জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৮৯৫২)। আজকের সমাজে নৈতিকতার সংকট স্পষ্ট। দুর্নীতি, চুরি, প্রতারণা, হিংসা ও অহংকার মানুষের জীবনকে অশান্ত করে তুলছে। এহেন পরিস্থিতিতে শান্তিময় সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ইসলামী শিক্ষার বিকল্প নেই।

​তরুণ প্রজন্ম ও ইসলামী শিক্ষা

​আজকের তরুণ প্রজন্ম আগামীর জাতির ভবিষ্যৎ ও কাণ্ডারি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজকের যুবসমাজ নানা বিভ্রান্তি ও প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে নিজের মূল পরিচয় ভুলে বসে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অপসংস্কৃতি ও ভুল দিকনির্দেশনা তাদের জীবনকে বিপথে পরিচালিত করছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামী শিক্ষাই হতে পারে তাদের জন্য আলোর দিশারী। এটি তাদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করবে এবং সঠিক-ভুলের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে।

​পরিবার ও সমাজে ইসলামী শিক্ষার ভূমিকা

​পরিবার হলো একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে সে নৈতিকতা, আচার-আচরণ ও সঠিক মূল্যবোধ শেখে। যদি পরিবার ইসলামী শিক্ষার আলোকে পরিচালিত হয়, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি মানুষকে একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায় এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। সমাজ ঠিক হয়ে গেলে এর প্রভাব অবশ্যই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পড়বে, যা একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে।

​ইসলামী শিক্ষার পুনর্জাগরণ ও সংস্কার

​সমকালীন বাস্তবতায় ইসলামী শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে তোলা জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক ও কার্যকর কারিকুলাম, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও ভাষা শিক্ষার সমন্বয় থাকবে। দায়িত্বশীল উলামায়ে কেরাম ও শিক্ষাবিদদের উচিত একসঙ্গে কাজ করে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বর্তমান বিশ্বের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। পাশাপাশি শিক্ষাপদ্ধতিতে নতুনত্ব আনাও প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

উপসংহার

সমকালীন বাস্তবতায় ইসলামী শিক্ষার অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। এটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও সমাজকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। বর্তমান বিশ্বের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামী শিক্ষাই হতে পারে সর্বোত্তম পথপ্রদর্শক। তাই আমাদের উচিত নিজেদের জীবন ও সমাজে ইসলামী শিক্ষার চর্চা বৃদ্ধি করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর আলোকে গড়ে তোলা।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন