Logo

ধর্ম

ইলমে দীন: প্রাসঙ্গিকতা, সংকট ও করণীয়

Icon

​লাবীব আবদুল্লাহ

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৪

ইলমে দীন: প্রাসঙ্গিকতা, সংকট ও করণীয়

​ইলম নূর ও আলোর পথ

​ইলম একটি নূর—উদ্ভাসিত আলো। এই প্রদীপ্ত আলো অজ্ঞতা দূর করে, আল্লাহর অধিকার ও বান্দার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ ও উত্তরাধিকারী।

​পশ্চিমাদের শিক্ষাদর্শ ও ইসলামের শিক্ষাদর্শ পরস্পর ভিন্ন। দুনিয়ায় অনেক পশুপাখি তাদের খাবারের ব্যবস্থা নিজেরা করলেও তাদের পড়ালেখা করতে হয় না। অনেক মানুষ পড়ালেখা না করেও কোটিপতি হতে পারে। মাদ্রাসা শিক্ষা বস্তুবাদী চিন্তার ওপর ভিত্তি করে নয়। এটি আল্লাহর রহমত; ফিতনার যুগেও আল্লাহ এই শিক্ষার ধারা অব্যাহত রেখেছেন। একদল মানুষকে আল্লাহ তাআলা এমন শক্তি ও ভালোবাসা দিয়েছেন যে, তারা আখিরাতের জন্য ইলম অর্জন করে এবং দুনিয়ার চাকচিক্য ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জন করে। তারা দুনিয়া ও অর্থনৈতিক উন্নতির প্রয়োজনীয়তা জানেন, তবু ইলম নিয়ে মগ্ন থাকেন। মাদ্রাসা শিক্ষা মূলত দুনিয়াবি অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যম নয়।

​লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি পশ্চিমাদের সেই শিক্ষা, যা চাকরি ও অর্থ উপার্জনের কৌশল শেখায়। সাধারণ শিক্ষায় পড়ালেখা করে অনেকে বিসিএস ক্যাডার হন বা সরকারের বিভিন্ন বিভাগে চাকরি করেন।

​শিক্ষার বিভাজন: দুনিয়া বনাম আখিরাত

​শিক্ষাকে দুনিয়া ও আখিরাত—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা উচিত নয় বলে আমি মনে করি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা উপমহাদেশে ২০০ বছরের শাসনে প্রাচীন মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিকৃত করে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা বিলুপ্ত করেছে। আগে মাদ্রাসা পড়েও সরকারি চাকরি করা যেত; সিলেবাস এমনভাবে সাজানো ছিল। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সম্মানী ভাতা পেত। রাষ্ট্রভাষা ছিল ফার্সি এবং ফিকহবিদরা বিচার ও শাসন পরিচালনা করতেন।

​যুগের পরিবর্তনে উপমহাদেশে শিক্ষা বিভক্ত হয়ে গেল—কেউ দুনিয়ার জন্য পড়ে, কেউ আখিরাতের জন্য। এর জন্য ওলামায়ে কেরাম দায়ী নন; বরং পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিতরা নিজেদের মূলধারা মনে করে মাদ্রাসা শিক্ষাকে গুরুত্বহীন করে তুলেছে।

​উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস

​পাকিস্তান আমলে মাদ্রাসা শিক্ষার কোনো উন্নতি হয়নি। আলেম-ওলামা দ্বীন টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের মতো ব্যবস্থা করেছেন। 'দরসে নিজামি' প্রায় ৩০০ বছর আগে উপমহাদেশের শিক্ষার সিলেবাস ছিল। একসময় আলিয়া মাদ্রাসা অনুসরণ করা হতো, এখনও কিছু কিতাব সেখানে রয়েছে।

​১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আগে দিল্লিতে অনেক নামকরা মাদ্রাসা ছিল এবং বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় হাজার হাজার মক্তব ছিল। ইংরেজরা সেগুলো ধ্বংস করে এবং মুসলিমদের ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল করে। এরপর থেকেই মাদ্রাসা শিক্ষা সমাজে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রাসা পরিচালিত হতো।

​বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

​১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর সাড়ে পাঁচ দশকেও সরকার ইলমে দীনের কেন্দ্রগুলোকে অবহেলা করেছে। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে এমএ (আরবি ও ইসলামিয়াত) সমমান দিলেও এই সনদের কার্যকারিতা নেই। দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিলেও তা বাস্তবে কাজে আসে না।

​কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ স্বকীয়তা বজায় রাখার নামে নিচের স্তরগুলোতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেয় না। এই যুক্তি ঠিক নয়। যারা একমাত্র আখিরাতের জন্য ইলম অর্জন করে, তারা স্বীকৃতি ছাড়াই পড়তে পারে। কিন্তু যাদের সনদ দরকার, তারা আলিয়া মাদ্রাসা বা সাধারণ শিক্ষা বেছে নেবে।

​সরকার ইচ্ছে করলে নিচের স্তরগুলোতে স্বীকৃতি দিতে পারে, তবে সেটা যেন আলিয়া মাদ্রাসার পথে না হয়; নইলে কওমি মাদ্রাসার অস্তিত্ব থাকবে না। আলিয়ার মতো কওমির শিক্ষার্থীরাও তখন ভার্সিটিমুখী হয়ে যাবে এবং দীনের পথ ছেড়ে দেবে। আমল ঠিক রেখে সহশিক্ষা বর্জন করে ভার্সিটিগুলোতে যেতে পারে, কিন্তু এটি কঠিন।

​সমস্যা ও সমালোচনা

​কওমি মাদ্রাসায় কুরআনের বিশুদ্ধ শিক্ষা ও ইলমে দীনের সঠিক পথ থাকলেও কিছু সমস্যা রয়েছে:

​১. সিলেবাসের সংকোচন: দরসে নিজামিতে একসময় গণিত, মহাকাশবিদ্যা ও যুক্তিবিদ্যা ছিল। কালের পরিক্রমায় সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ কুরআনের অনেক আয়াত বুঝতে বিজ্ঞানের প্রয়োজন। ব্যবসা-বাণিজ্য, যুদ্ধবিদ্যা ও আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণিত ও বিজ্ঞান আবশ্যক—এগুলো শরিয়তবিরোধী নয়।

​২. ভাষার মাধ্যম: আরবির চেয়ে উর্দু ও ফার্সিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। উর্দু-ফার্সি সংরক্ষণের জন্য পৃথক বিভাগ খোলা যেতে পারে, কিন্তু শিক্ষার মাধ্যম আরবি ও মাতৃভাষা বাংলা হওয়া উচিত। সময়ের প্রয়োজনে ইংরেজি, জার্মান, চীনা ও তুর্কি ভাষা শেখারও ব্যবস্থা থাকা দরকার।

​৩. নোট-গাইড নির্ভরতা: বর্তমানে আরবি বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীরা বাংলা নোট-গাইডের পথ ধরেছে। বোর্ডগুলো পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, যেখানে সনদের কোনো সরকারি মূল্য নেই; তবু শিক্ষার্থীরা যোগ্যতা না বাড়িয়ে সনদের পেছনে ছোটে।

​৪. কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা: মাদ্রাসা শিক্ষার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে অযোগ্য ‘সাহেবজাদা’ সংস্কৃতি মুক্ত করতে হবে এবং আত্মীয়-স্বজন নিয়োগ বন্ধ করে যোগ্য লোক নিয়োগ করতে হবে। খেয়ানত ও অনিয়ম দূর করা জরুরি।

​৫. উচ্চশিক্ষার মানসিকতা: কওমি মাদ্রাসায় সবাইকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) করানোর মানসিকতা সমস্যা তৈরি করেছে। মেধাহীনরা সনদ পাচ্ছে এবং মনে করছে সরকারি চাকরি পাবে—অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। আর্থিক সমস্যায় যারা আছে, তারা ফরজ পরিমাণ শিক্ষা অর্জন করে উপার্জনের পথ খুঁজে নেবে। যাদের সামর্থ্য ও মনোবল আছে, তারা দীর্ঘ সাধনায় গভীর আলেম হবে। এখানে কোনো ‘শর্টকাট’ নেই।

​করণীয় ও সম্ভাবনা

​১. বিজ্ঞান ও আধুনিক ভাষার অন্তর্ভুক্তি: সরকারি স্বীকৃতি ছাড়াই মাদ্রাসার সুন্দর পরিবেশে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের নানা বিষয় পড়ানো যেতে পারে। শুধু চাকরির জন্য নয়, বরং কুরআন ও সমকাল বুঝতেও এগুলো প্রয়োজন।

​২. বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ: মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন দেশের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিক্ষাচুক্তি করতে পারে। মাধ্যমিক স্তরে স্বীকৃতি নিয়ে বিদেশে অনার্স-মাস্টার্স করার ব্যবস্থা করা জরুরি।

​৩. বাস্তববাদী দৃষ্টি: কওমি মাদ্রাসার জন্য সরকারি বাজেট বরাদ্দ না থাকার বাস্তবতা মেনেই কর্তৃপক্ষকে এগোতে হবে। আত্মনির্ভরশীলতা এখানে মূল চাবিকাঠি।

​৪. নিজস্ব উপার্জনের পথ: শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির আশা না করে নিজস্ব উপার্জনের পথ বেছে নেবে। ইলমে দীনের সেবার পাশাপাশি হালাল পেশা অবলম্বন করলে আল্লাহ তাতে বরকত দেবেন।

​৫. সংলাপের পথ: শিক্ষার্থীরা যদি কোনো সংকটে পড়ে, তবে বিদ্রোহ নয় বরং প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে মুরুব্বী ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজবে।

​৬. দ্বীনি ও দুনিয়াবি শিক্ষার সমন্বয়: কওমি মাদ্রাসার পর সাধারণ শিক্ষা অর্জন করা অপরাধ নয়। আখিরাতের জন্য ইলমে দীন এবং দুনিয়ার প্রয়োজনে আধুনিক শিক্ষা—এই দুইয়ের সমন্বয় সম্ভব।

উপসংহার: ইলমে দীন শিক্ষার অনেক সংকট থাকলেও সম্ভাবনাও অপরিসীম। আল্লাহ যাদের ইলম দেন, তাদের সম্মানিত করেন। তাওয়াক্কুল করে ইলমের সেবার পাশাপাশি হালাল পেশা অবলম্বন করলে আল্লাহ বরকত দেন। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা বুঝে এগোতে হবে। কওমি মাদ্রাসার মর্যাদা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে যদি আমরা সংকট চিহ্নিত করি এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজি।

লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক ও লেখক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন