ইসলামী শরিয়তে হালাল-হারামের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও এ বিধান কঠোরভাবে প্রযোজ্য। বিশেষ করে জবাইকৃত প্রাণীর গোশত হালাল হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য। ফকিহগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো—প্রাণী জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা একটি মৌলিক শর্ত। জবাইকারী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বা অবহেলাবশত ‘বিসমিল্লাহ’ বলা পরিত্যাগ করে, তাহলে সেই প্রাণীর গোশত হালাল থাকে না; বরং তা হারাম হয়ে যায়।
অতএব, যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে কোনো প্রাণী জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা হয়নি—তা সে ইচ্ছাকৃত হোক বা গাফিলতির কারণে—তাহলে ওই গোশত ভক্ষণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সমাজে এ ব্যাপারে দুঃখজনকভাবে ব্যাপক উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়।
বড় আকৃতির পশু, যেমন—গরু বা ছাগল জবাইয়ের সময় আমরা অনেকেই যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করি এবং গুরুত্বের সাথে ‘বিসমিল্লাহ’ বলি। কিন্তু এর বিপরীতে ছোট প্রাণী বা পাখি, যেমন—মুরগি, কবুতর ইত্যাদি জবাইয়ের ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। যেন বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়—এমন একটি মনোভাব অজান্তেই গড়ে উঠেছে।
বর্তমান সময়ে বাজারের মুরগির দোকানগুলোতে এ অবহেলা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক দোকানে একসাথে বিপুল পরিমাণ মুরগি জবাই করা হয়, বিশেষ করে হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা বিবাহ-শাদীর মতো বড় আয়োজনের জন্য। এইসব ক্ষেত্রে দ্রুততার সাথে কাজ সম্পন্ন করার চাপে ‘বিসমিল্লাহ’ বলার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক কর্মচারী শরিয়তের মৌলিক মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কেই অজ্ঞ। তারা ‘বিসমিল্লাহ’ বলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে অবহিত নয়, আবার তা না বলার ভয়াবহ পরিণতিও তাদের জানা নেই। ফলে দেখা যায়—কেউ জবাইয়ের সময় কিছুই উচ্চারণ করে না, কেউবা অস্পষ্টভাবে কিছু বলে, আবার কেউ শুধু ‘আল্লাহু আকবার’ বলেই দায় সারে।
এমনও দৃশ্য চোখে পড়ে যে, কেউ মুখে বিড়ি বা সিগারেট নিয়ে জবাই করছে, কেউ মুখে মাস্ক পরে সম্পূর্ণ নীরব অবস্থায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কখনো দেখা যায়, একজন জবাই করছে আর অন্যজন ‘বিসমিল্লাহ’ বলছে—যা শরিয়তের বিধান অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি অনেক সময় ঠোঁট না নাড়িয়ে কেবল মুখে কিছু আওড়ানোর ভান করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে কোনো গুরুত্ব বহন করে না।
এসব চিত্র আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে গভীরভাবে চিন্তার বিষয়। হালাল খাদ্য গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য শুধু একটি সাধারণ কর্তব্য নয়; বরং এটি ঈমান ও আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা যা খাই, তা আমাদের দেহ-মন এবং ইবাদতের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই হালাল-হারামের ব্যাপারে উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব—প্রথমত নিজে সচেতন হওয়া এবং দ্বিতীয়ত সমাজের অন্যদের মাঝেও সচেতনতা সৃষ্টি করা। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে বাজারভিত্তিক জবাই প্রক্রিয়ায় যেসব ত্রুটি ও অবহেলা দেখা যায়, তা সংশোধনের জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামান্য সচেতন হই, তাহলে এ সমস্যার অনেকাংশই দূর করা সম্ভব।
বাজার থেকে মাংস ক্রয়ের সময় জবাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে যতটা সম্ভব খোঁজ নেওয়া, বিক্রেতাদেরকে বিষয়টির গুরুত্ব বোঝানো এবং প্রয়োজনে শরিয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা আমাদের নৈতিক ও দ্বীনি দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আমরা শুধু নিজের জন্য হালাল খাদ্য নিশ্চিত করবো না, বরং সমাজের সামগ্রিক পরিবেশকেও পবিত্র রাখতে সহায়তা করবো।
এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বাস্তবধর্মী ও কার্যকর উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে—
১. বিক্রেতা ও মালিককে সচেতন করা
মুরগি বা অন্যান্য প্রাণী বিক্রেতা দোকানদারদেরকে আন্তরিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, যেন তারা জবাইয়ের জন্য এমন কর্মচারী নিয়োগ দেন, যারা শরিয়তের বিধান সম্পর্কে অবগত এবং গুরুত্ব সহকারে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে জবাই করে। এ বিষয়ে তাদেরকে বোঝাতে হবে যে, এটি শুধু ধর্মীয় দায়িত্বই নয়, বরং ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. জবাইয়ের সময় উপস্থিত থাকা
সম্ভব হলে মুরগি বা অন্য কোনো প্রাণী কেনার সময় নিজে উপস্থিত থেকে জবাই করানো যেতে পারে। এ সময় জবাইকারীকে স্পষ্টভাবে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে অনুরোধ করা উচিত। এতে একদিকে নিজের দায়িত্ব পালন হয়, অন্যদিকে জবাইকারীও সচেতন হয়ে ওঠে।
৩. ইমাম-খতীবদের ভূমিকা জোরদার করা
যেসব বাজারে বৃহৎ পরিসরে মুরগি বা অন্যান্য প্রাণী বিক্রি হয়, সেসব এলাকার সম্মানিত ইমাম ও খতীবগণ জুমার খুতবা, ওয়াজ-মাহফিল এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনায় এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে পারেন। ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে আলোচনা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিক্রেতারাও বিষয়টি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে।
৪. শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণ
কোরবানির সময় যেমন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রমে জবাই ও প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে, তেমনি সারা বছরও নির্দিষ্ট সময়ে তারা বাজারে গিয়ে জবাই কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে পারে। এতে একদিকে শরিয়তসম্মত জবাই নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হবে।
৫. সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করা (বয়কট)
যদি কোনো বিক্রেতাকে একাধিকবার সতর্ক করার পরও তার মধ্যে অবহেলা বা গাফিলতি পরিলক্ষিত হয়, তাহলে সাময়িকভাবে তার দোকান বয়কট করা যেতে পারে। এটি একটি কার্যকর সামাজিক পদক্ষেপ, যা অন্য বিক্রেতাদের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো খাবার হালাল ও সন্দেহমুক্ত হওয়া। হালাল খাদ্য নিশ্চিত করা কেবল ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়; এটি অবশ্য পালনীয় একটি গুরুদায়িত্ব। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিই, তাহলে খুব সহজেই সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের খাদ্যকে পবিত্র ও বরকতময় করুন।
লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদ্রাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।

