Logo

ধর্ম

জিলহজের প্রস্তুতি ও হজের বিধান

Icon

​আব্দুস সাত্তার সুমন

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:১৪

জিলহজের প্রস্তুতি ও হজের বিধান

​ইসলামের বরকতময় মাসগুলোর মধ্যে জিলহজ বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসেই সম্পাদিত হয় ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ ‘হজ’। হজ হলো আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক অনন্য প্রশিক্ষণ। তাই এই মাসকে ঘিরে প্রত্যেক মুসলমানের প্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

​জিলহজ মাসের ফজিলত ও প্রস্তুতি

​জিলহজের প্রথম দশ দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচিত। মহান আল্লাহ বলেন, ​"ফজরের শপথ, এবং দশ রাতের শপথ।" (সূরা আল-ফজর, আয়াত: ১-২)

​হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ​"এই দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।" (সহিহ বুখারি: ৯৬৯)

​এই দিনগুলোতে করণীয়

​নফল নামাজ, রোজা ও দান-সদকা বৃদ্ধি করা।

​অধিক পরিমাণে তাকবির (আল্লাহু আকবার), তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করা।

​তওবা করা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকা।

​হজের পূর্ব প্রস্তুতি: ইলম ও আমল

​হজের সফর শুরু হয় নিয়ত থেকে। তাই সর্বপ্রথম প্রয়োজন বিশুদ্ধ নিয়ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

​"কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" (সহিহ বুখারি: ১)

​হজের আগে করণীয়

​হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা।

​ঋণ পরিশোধ করা।

​পরিবারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া।

​হজের মাসআলা শিক্ষা করা।

​সফরের জন্য শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া।

​কার ওপর হজ ফরজ?

​মহান আল্লাহ বলেন, ​"মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য হজ করা ফরজ, যে তার কাছে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।" (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)

​ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ

১. মুসলিম হওয়া।

২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।

৩. সুস্থ ও স্বাধীন হওয়া।

৪. আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা থাকা।

৫. পথ নিরাপদ থাকা।

​জীবনে হজ কতবার ফরজ?

হজ জীবনে মাত্র একবার ফরজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

​"হজ একবার ফরজ, এর বেশি করলে তা নফল।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৭২১)

​হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহ

​ফরজ (৩টি):

১. ইহরাম বাঁধা।

২. আরাফায় অবস্থান।

৩. তাওয়াফে জিয়ারত।

​ওয়াজিব (প্রধান কয়েকটি):

​সাফা-মারওয়া সায়ী করা।

​মুযদালিফায় অবস্থান করা।

​মিনায় রাত্রিযাপন করা।

​শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা।

​কুরবানি করা (তামাত্তু ও কিরান হজের ক্ষেত্রে)।

সুন্নাহ

​ইহরামের আগে গোসল করা।

​তাওয়াফে রমল ও ইজতিবা করা।

​অধিক দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করা।

​হজের দিনগুলোর ধারাবাহিক আমল (৮–১৩ জিলহজ)

​৮ জিলহজ (ইয়াওমুত তারবিয়া): ইহরাম বেঁধে মিনায় যাত্রা।

​৯ জিলহজ (আরাফা দিবস): আরাফায় অবস্থান—এটি হজের মূল স্তম্ভ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "হজ হলো আরাফা।" (তিরমিজি: ৮৮৯)

​১০ জিলহজ (ইয়াওমুন নাহর): শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, কুরবানি, মাথা মুন্ডন/চুল কাটা ও তাওয়াফে জিয়ারত।

​১১–১৩ জিলহজ: মিনায় অবস্থান ও প্রতিদিন তিন শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ।

​যারা হজে যেতে পারবেন না, তাদের করণীয়

​হজের সৌভাগ্য সবার নাও হতে পারে, কিন্তু ইবাদতের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ:

​৯ জিলহজ (আরাফা দিবস) রোজা রাখা।

​তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদ পাঠ করা।

​সামর্থ্য অনুযায়ী কুরবানি করা।

​বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা।

​রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ​"আরাফার দিনের রোজা পূর্বের ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।" (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

​হজের আগে ও পরে জীবনধারা

​হজের আগে: আন্তরিক তওবা, মানুষের হক আদায় ও হজের সঠিক ইলম অর্জন করা।

হজের পরে: গুনাহ থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত নামাজ ও তাকওয়া অবলম্বন এবং নিজের চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

​রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ​"মাবরুর হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।" (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩)

​হজ এমন এক ইবাদত, যা মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে। এটি কেবল একটি ভ্রমণ নয়; বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধির এক মহাসফর। জিলহজ মাস আমাদের সামনে নিজেকে সংশোধন করার এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।

​আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করার এবং তা জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, মানিকদি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন