আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস আজ
শব্দদূষণ প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৪
প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস। ২০২৬ সালের এই দিবসের লক্ষ্য হলো শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করা। বর্তমান যুগে যানবাহনের অতিরিক্ত হর্ন, উচ্চস্বরে মাইকিং, শিল্পকারখানার বিকট আওয়াজ, সামাজিক অনুষ্ঠানের শব্দ, এমনকি কটু ভাষা—সব মিলিয়ে শব্দদূষণ এক ভয়াবহ সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য, শৃঙ্খলা ও অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান শেখায়। কোরআন ও হাদিসে শব্দ, কণ্ঠস্বর, বাক্য ও সামাজিক আচরণ বিষয়ে এমন নির্দেশনা রয়েছে, যা শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।
কোরআনের আলোকে শব্দ ও কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ
১. কণ্ঠস্বর নিচু রাখার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তুমি তোমার চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রাখো; নিশ্চয়ই সব আওয়াজের মধ্যে গাধার আওয়াজই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।” — (সূরা লুকমান: ১৯)
শিক্ষা: এ আয়াতে কণ্ঠস্বরের সংযম, ভদ্রতা ও সামাজিক সৌন্দর্যের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অহেতুক উচ্চশব্দ, চিৎকার ও বিরক্তিকর আওয়াজ ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।
২. উত্তম ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ
“আর আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন উত্তম কথাই বলে। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে।” — (সূরা আল-ইসরা: ৫৩)
শিক্ষা: শব্দদূষণ শুধু যান্ত্রিক শব্দ নয়; গালি, কটু ভাষা ও অপমানজনক শব্দও সামাজিক অশান্তির কারণ।
৩. ইবাদতে সংযত শব্দ
“তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো বিনয়ের সাথে ও নিভৃতে।” — (সূরা আল-আরাফ: ৫৫)
শিক্ষা: ইবাদতেও ভারসাম্য, বিনয় ও অন্যের স্বস্তির প্রতি সম্মান জরুরি।
৪. পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি নিষিদ্ধ
“পৃথিবীতে সংশোধনের পর তোমরা বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।” — (সূরা আল-আরাফ: ৫৬)
শিক্ষা: শব্দদূষণও সামাজিক ও পরিবেশগত বিপর্য্যের অংশ হতে পারে।
হাদিসের আলোকে শব্দ, ভাষা ও সামাজিক দায়িত্ব
১. ভালো কথা বলো, নতুবা নীরব থাকো
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।” — (সহিহ বুখারি: ৬০১৮, সহিহ মুসলিম: ৪৭)
শিক্ষা: অপ্রয়োজনীয় শব্দ, কটু ভাষা, চিৎকার বা বিরক্তিকর আওয়াজ পরিহার করা ঈমানি আচরণ।
২. মুসলিম সেই, যার জিহ্বা থেকে অন্যরা নিরাপদ
“মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” — (সহিহ বুখারি: ১০, সহিহ মুসলিম: ৪০)
শিক্ষা: জিহ্বার অপব্যবহার—গালি, অপমান, কটু শব্দ—সবই অন্যের কষ্টের কারণ।
৩. ক্ষতি করা নিষিদ্ধ
“ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধও ক্ষতির মাধ্যমে নেওয়া যাবে না।” — (সুনান ইবনে মাজাহ: ২৩৪০, মুআত্তা মালেক: ১৪৬১)
শিক্ষা: অতিরিক্ত শব্দ দিয়ে মানুষের ঘুম, স্বাস্থ্য বা মানসিক শান্তি নষ্ট করাও ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত।
৪. উত্তম বাক্য সদকা
“উত্তম বাক্যও সদকা।” — (সহিহ বুখারি: ২৯৮৯, সহিহ মুসলিম: ১০০৯)
শিক্ষা: সুন্দর শব্দ শুধু শালীনতা নয়; এটি সওয়াবের কাজও।
আধুনিক যুগে শব্দদূষণের বাস্তবতা
আজ শব্দদূষণের বড় উৎসগুলো হলো:
যানবাহন: অপ্রয়োজনীয় হর্ন, বিকট মোটরসাইকেল শব্দ ও সড়কে চিৎকার।
সামাজিক অনুষ্ঠান: বিয়ে ও মাহফিলে অতিরিক্ত মাইক, রাজনৈতিক সভা ও রাতভর উচ্চস্বরে গান।
নগরজীবন: নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা ও বাজারের কোলাহল।
ক্ষতিকর প্রভাব:
উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগের ঝুঁকি, অনিদ্রা, শিশুদের মনোযোগহানি, রোগী ও বৃদ্ধদের কষ্ট এবং মানসিক চাপ।
পরিবারে ইসলামী শব্দ সচেতনতা
রাসূলুল্লাহ (সা.) কোমলতা পছন্দ করতেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমল; তিনি কোমলতা পছন্দ করেন।” — (সহিহ মুসলিম: ২৫৯৩)
করণীয়:
১. সন্তানদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলা।
২. দাম্পত্য সম্পর্কে উচ্চস্বরে ঝগড়া পরিহার করা।
৩. ঘরে টিভি বা মোবাইলের শব্দ সীমিত রাখা।
৪. রাতে প্রতিবেশীর শান্তি নিশ্চিত করা।
বিশেষ স্থানসমূহে শব্দ নিয়ন্ত্রণ
মসজিদ: রাসূল (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেন কুরআন তিলাওয়াতে অন্যকে কষ্ট না দেয়।” — (সুনান আবু দাউদ: ১৩৩২)
শিক্ষা: ইবাদতের স্থানেও এমন শব্দ করা উচিত নয়, যা অন্যের মনোযোগ নষ্ট করে।
হাসপাতাল ও স্কুল: রোগী, শিশু ও শিক্ষার্থীদের শান্তি রক্ষা করা ইসলামী মানবিকতার অংশ।
পরিবেশ ও সমাজে দায়িত্ব
ইসলাম পৃথিবীকে আমানত হিসেবে দেখে। শব্দদূষণ রোধ তাই শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও।
সামাজিক করণীয়:
১. অপ্রয়োজনীয় হর্ন বন্ধ করা।
২. মাইক ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতিমালা মানা।
৩. স্কুল-হাসপাতাল এলাকায় নিরবতা পালন করা।
৪. ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে শব্দসীমা বজায় রাখা।
৫. শিশুদের শুদ্ধ ও মার্জিত ভাষা শিক্ষা দেওয়া।
পরিশেষে, আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শব্দ শুধু যোগাযোগ নয়; এটি নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়। কোরআন ও হাদিসে কণ্ঠস্বর সংযম, উত্তম বাক্য, অন্যকে কষ্ট না দেওয়া এবং পরিবেশে শান্তি বজায় রাখার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা আজকের শব্দদূষিত বিশ্বে অত্যন্ত কার্যকর।
মনে রাখা জরুরি: অতিরিক্ত শব্দ শ্রবণশক্তি নষ্ট করে, আর কটু শব্দ হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে। সংযত কণ্ঠ, সুন্দর ভাষা ও নীরবতা—এসবই ইসলামী সভ্যতার সৌন্দর্য। তাই আসুন, কোরআন ও হাদিসের আলোকে শব্দদূষণ রোধ করি, সংযত হই এবং শান্তিপূর্ণ মানবিক সমাজ গড়ে তুলি।
লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

