শিক্ষাঙ্গনে ইসলাম চর্চা: কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ কেন
ড. মাহবুবুর রহমান
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৪
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম। এটি কোনো বিতর্কিত তথ্য নয়, এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ এই দেশের স্কুল-কলেজের দিকে তাকালে একটি বিস্ময়কর চিত্র ভেসে ওঠে- শিক্ষার্থীরা ইসলাম পড়ছে, কিন্তু ইসলাম চর্চা করছে না। ইসলাম শিক্ষা একটি বিষয় হিসেবে পাঠ্যক্রমে আছে বটে, কিন্তু সেটি কার্যত পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার হাতিয়ার মাত্র। জীবনে প্রয়োগের জন্য নয়, আমল করার জন্য নয়, চরিত্র গঠনের জন্যও নয়। প্রশ্ন হলো-এই বিস্তর ফারাকটা কেন তৈরি হলো? এবং এটি কীভাবে দূর করা যায়?
পাঠ্যক্রমে ইসলামের অবস্থান: সংখ্যায় আছে, সারবত্তায় নেই
বাংলাদেশের সরকারি শিক্ষাক্রমে ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ নামে একটি বিষয় আছে। কিন্তু এই বিষয়টির গুরুত্ব কতটুকু? বাস্তবে এটি প্রায়ই ঐচ্ছিক বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, মুখস্থনির্ভর প্রশ্নের ছড়াছড়ি- কোন সূরার কয়টি আয়াত, অমুক হাদিসের রাবি কে, ইত্যাদি। কিন্তু নামাজ কেন পড়তে হয়, ইসলামি জীবনব্যবস্থা কীভাবে একজন মানুষকে পূর্ণ করে- এই গভীরতার শিক্ষা প্রায় অনুপস্থিত।
ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোতে চিত্র আরও করুণ। সেখানে ইসলাম শিক্ষার কোনো কার্যকর কাঠামো নেই বললেই চলে। পাশ্চাত্যের শিক্ষাক্রম অনুসরণ করতে গিয়ে ধর্মীয় শিক্ষাকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। এমনকি অনেক বাংলা মাধ্যম প্রতিষ্ঠানেও দেখা যায়, ইসলাম শিক্ষার শিক্ষকের পদটি কম গুরুত্বের, সুযোগ-সুবিধাও কম।
এই মানসিকতা কোথা থেকে আসে? উত্তর খুঁজতে হলে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে একটু ফিরে তাকাতে হবে। ব্রিটিশ আমলে যে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা মূলত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মকে শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে সেই কাঠামোটি পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়নি, বরং নতুন নামে বহাল থেকেছে।
পরিবেশ নেই, তাই চর্চাও নেই
শুধু পাঠ্যক্রমের দোষ দিলেই হবে না। বাস্তব পরিবেশও ইসলাম চর্চার অনুকূলে নয়। দেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজে মসজিদ বা নামাজের জায়গা নেই। জোহরের ওয়াক্তে যখন আজান পড়ে, তখন একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর কোথায় নামাজ পড়ার কথা? সেই সুযোগ অনেক প্রতিষ্ঠানেই নেই। নামাজের বিরতি নেই, সুবিধামতো পোশাকের স্বাধীনতা নেই, মেয়েদের হিজাব পরার অনুকূল পরিবেশ নেই।
সহশিক্ষার বিষয়টিও এখানে প্রাসঙ্গিক। ইসলাম ছেলে-মেয়ের অবাধ মেলামেশায় সংযম রাখতে বলে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই বিষয়ে কোনো ইসলামসম্মত বিন্যাস বা সচেতনতা নেই। ফলে যে শিক্ষার্থী ইসলামি আদর্শ ধারণ করতে চায়, তাকে একা সাঁতরাতে হয় প্রতিকূল স্রোতে।
লেবাস বা পোশাকের প্রশ্নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিয়ে অলিখিত বাধা রয়েছে। কোথাও ইউনিফর্মের অজুহাতে, কোথাও সামাজিক চাপে। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এটি অত্যন্ত হতাশাজনক।
সংস্কৃতির সংঘাত: পশ্চিমা আধিপত্য বনাম ইসলামি মূল্যবোধ
আধুনিক বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনের সংস্কৃতি অনেকটাই পশ্চিমামুখী। সিনেমা, সংগীত, ফ্যাশন, জীবনধারা- এসব ক্ষেত্রে পশ্চিমা মানদণ্ডকেই ‘উন্নত’ বলে ধরে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারলে ‘স্মার্ট’, ইসলামি পোশাক পরলে ‘পুরনো ধাঁচের’। এই মানসিকতা তৈরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনেকখানি।
অন্যদিকে, ইসলামকে অনেক সময় কেবল আরবি মুখস্থের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ইসলামের যে বৌদ্ধিক, নৈতিক ও সামাজিক সৌন্দর্য আছে, তা শিক্ষার্থীদের সামনে কার্যকরভাবে তুলে ধরা হয় না। ফলে তরুণরা ইসলামকে জীবনের সাথে সংযুক্ত মনে করে না, বরং একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখে।
সমস্যার মূলে যা আছে
বিষয়টিকে সরল করে বললে সমস্যা তিনটি স্তরে বিদ্যমান।
প্রথমত, নীতিগত স্তরে: শিক্ষাক্রম প্রণয়নে ইসলামি চেতনাকে যথাযথ স্থান দেওয়া হয়নি। ইসলাম শিক্ষাকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শনের ভিত্তিতে নয়, বরং একটি আলাদা ‘বিষয়’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে অন্য বিষয়গুলোর সঙ্গে এর সংহতি নেই, জীবনের সঙ্গেও নেই।
দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইসলাম চর্চার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো তৈরি করেনি। মসজিদ নেই, নামাজের সুযোগ নেই, ইসলামি কালচার চর্চার জায়গা নেই।
তৃতীয়ত, মানসিকতার স্তরে: শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রশাসন অনেক সময় মনে করেন ইসলাম চর্চা ব্যক্তিগত বিষয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর স্থান নেই। এই ভুল ধারণাটি পুরো ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।
প্রতিকার ও সমাধানের পথ
সমস্যাটি জটিল, কিন্তু অসমাধানযোগ্য নয়। কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
১. পাঠ্যক্রম সংস্কার: ইসলাম শিক্ষাকে কেবল মুখস্থনির্ভর না রেখে জীবনঘনিষ্ঠ করতে হবে। নামাজ, রোজা, আখলাক, পারিবারিক জীবন, সামাজিক দায়িত্ব—এসব বিষয় আলোচনামূলকভাবে পড়ানো দরকার। শিক্ষার্থী কেন নামাজ পড়বে সেটি বোঝানো দরকার, শুধু কীভাবে পড়তে হয় তা নয়।
২. অবকাঠামো নির্মাণ: প্রতিটি স্কুল-কলেজে নামাজের স্থান বাধ্যতামূলক করা উচিত। মেয়েদের জন্য আলাদা এবং যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। জোহর ও আসরের নামাজের জন্য সংক্ষিপ্ত বিরতির বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
৩. পোশাকের স্বাধীনতা: ইউনিফর্মের নামে হিজাব বা ইসলামি পোশাকে বাধা দেওয়া যাবে না। বরং ইউনিফর্মের মধ্যেই ইসলামি শালীনতার বিধান পালনের সুযোগ রাখতে হবে। এটি শিক্ষার্থীর ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন।
৪. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ: ইসলাম শিক্ষার শিক্ষকদের শুধু বিষয়জ্ঞান নয়, আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একজন ভালো শিক্ষক ক্লাসরুমকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন- সেই শিক্ষক তৈরিতে বিনিয়োগ করা জরুরি।
৫. ইসলামি কালচারের চর্চা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে- সীরাতুন্নবী (সা.) আলোচনা, ইসলামি বইমেলা, নৈতিকতাভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ইত্যাদি। এগুলো শিক্ষার্থীদের ইসলামের সঙ্গে আবেগীয় সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করবে।
৬. অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা: ঘর থেকে যদি ইসলামি মূল্যবোধ চর্চা না হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে সমন্বয় দরকার। অভিভাবক সমাবেশে এই বিষয়গুলো নিয়মিত আলোচনায় আনা যেতে পারে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ
শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? শুধু সার্টিফিকেট অর্জন? নাকি একজন মানুষকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা? যদি দ্বিতীয়টিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তাহলে ইসলাম শিক্ষাকে কেন্দ্রে রাখা ছাড়া বিকল্প নেই- অন্তত এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে।
ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এই জীবনব্যবস্থার আলোকে গড়ে ওঠা একজন মানুষ সৎ, দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী এবং ন্যায়পরায়ণ হবে- এটি কেবল ধর্মীয় দাবি নয়, ইতিহাসও সাক্ষী।
কিন্তু সেই মানুষ তৈরি হবে কীভাবে, যদি শিক্ষাঙ্গনে ইসলামের কোনো জীবন্ত উপস্থিতি না থাকে? পাঠ্যবইয়ের পাতায় আটকে থাকা ইসলাম কখনো হৃদয়ে প্রবেশ করে না। ইসলাম হৃদয়ে প্রবেশ করে যখন সে তা দেখে, অনুভব করে এবং চর্চায় অভ্যস্ত হয়।
তাই এখনই সময় আমাদের শিক্ষাঙ্গনকে নতুনভাবে ভাবার। নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং সমাজের সচেতন অংশকে একসাথে দাঁড়াতে হবে এই প্রশ্নের সামনে- আমরা কি সত্যিই চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইসলামি মূল্যবোধে গড়ে উঠুক? যদি চাই, তাহলে কেবল পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইসলামকে শিক্ষাঙ্গনের প্রাণে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এটি কোনো মৌলবাদের আহ্বান নয়। এটি একটি মুসলিম জাতির নিজের শিকড়ের দিকে ফেরার আহ্বান- সুস্থ, সুন্দর এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য।
লেখক: প্রভাষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

