ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিশুদ্ধতা রক্ষা, মুসলিম সমাজের আকিদা-বিশ্বাস সংস্কার এবং কোরআন-সুন্নাহর সঠিক আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসা এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে হিজরি চতুর্দশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সমাজ থেকে নানাবিধ বাতিল মতবাদ, কুসংস্কার, শিরক এবং বিদআত (বেদাত) নির্মূলে কওমি ধারার আলেম সমাজ ও দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে কাজ করেছে।
১. বিশুদ্ধ আকিদা ও সুন্নাহর পুনরুজ্জীবন
কওমি মাদরাসার মূল ভিত্তিই রচিত হয়েছে সুন্নাহর পুনরুজ্জীবন এবং বিদআতের মূলোৎপাটনের সংকল্প নিয়ে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের প্রদর্শিত সরল পথ (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত)-এর আলোকে কওমি মাদরাসাগুলো মুসলিম সমাজকে গড়ে তোলে। হাদিসের সর্বোচ্চ কিতাবসমূহের (দাওরায়ে হাদিস) চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনটি সুন্নাহ আর কোনটি বিদআত, তা সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়।
২. বিদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম
সমাজ সংস্কারে কওমি মাদরাসা ও উলামায়ে কেরাম কখনো আপস করেননি। সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন মনগড়া ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মিলাদ-কিয়ামের নামে অতিরঞ্জন, কবর বা মাজারকেন্দ্রিক শিরক ও বিদআতি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কওমি আলেমরাই প্রথম সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। জুমার খুতবা, ওয়াজ মাহফিল এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সেমিনারের মাধ্যমে কওমি আলেম সমাজ সাধারণ মুসলমানদের বুঝিয়েছেন যে, ইবাদতের নামে নতুন কিছু আবিষ্কার করাই হলো বিদআত, যা বর্জনীয়।
৩. বাতিল মতবাদের যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবেলা
বিভিন্ন যুগে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানা নানা বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে কওমি মাদরাসার অবদান চিরস্মরণীয়।
কাদিয়ানি ফিতনা প্রতিরোধ: খতমে নবুয়ত (নবীজির শেষ নবী হওয়া) সুরক্ষায় কওমি আলেমদের আন্দোলন ও আইনি লড়াই বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে তারা রাজপথ থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মোকাবেলা: আধুনিক যুগে ইসলামের বিরুদ্ধে যে বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার ও নাস্তিক্যবাদের উত্থান ঘটেছে, কওমি মাদরাসার পণ্ডিতগণ যুক্তিনির্ভর বই-পুস্তক এবং লেখনীর মাধ্যমে তার দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে যাচ্ছেন।
শিয়া, খারেজি ও অন্যান্য ভ্রান্ত দল: ইসলামের নামে গড়ে ওঠা বিভিন্ন উগ্র বা বিচ্যুত দলগুলোর আকিদাগত বিভ্রান্তি উন্মোচন করতে কওমি ধারার উলামায়ে কেরাম সব সময় সজাগ থেকেছেন।
৪. লেখনী ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সংস্কার
শুধু মুখের বয়ানেই নয়, কওমি মাদরাসার আলেমগণ লিখনীর মাধ্যমেও বাতিল ও বিদআতের প্রতিবাদ করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)-এর সংস্কারের ধারাবাহিকতায় কওমি ধারার আলেমগণ হাজার হাজার কিতাব, ফতোয়া এবং গবেষণাপত্র তৈরি করেছেন।
ফতোয়ার নির্ভরযোগ্য কিতাব (যেমন: ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ, ফতোয়ায়ে ফয়জুল বারী ইত্যাদি) সমাজের সাধারণ মানুষকে দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ বিদআত থেকে বাঁচতে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
৫. সামাজিক ও নৈতিক পুনর্গঠন
কওমি মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যান। মক্তব শিক্ষার মাধ্যমে একদম শৈশব থেকেই শিশুদের মনে খাঁটি ইসলামের বীজ বুনে দেওয়া হয়। এর ফলে সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শিরক ও বিদআত থেকে দূরে থাকার নৈতিক শক্তি লাভ করে।
উপসংহার: কওমি মাদরাসা কেবল কিছু চুন-সুরকির দালানকোঠা নয়, বরং এটি ইসলামের আকিদা ও বিশ্বাসের অতন্দ্র প্রহরী। মুসলমানদের ইমান-আকিদা ধ্বংস করার জন্য যখনই কোনো বাতিল শক্তি বা বিদআতি প্রথার জন্ম হয়েছে, কওমি মাদরাসার আলেমগণ তখনই নিজেদের জীবন ও মেধা বাজি রেখে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। ফলশ্রুতিতে, শত ঝড়ের মাঝেও এই উপমহাদেশে ইসলামের আসল সৌন্দর্য আজ অবিকৃত রয়েছে। সমাজকে পঙ্কিলতামুক্ত রাখতে কওমি মাদরাসার এই অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
লেখক: ইমাম ও খতিব, টোটালিয়াপাড়া জামে মসজিদ, সাভার, ঢাকা

