মামুনুল ইসলাম
বাংলাদেশের ফুটবল আকাশে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে আলো ছড়ানো মামুনুল ইসলাম এবার থামার ঘোষণা দিয়েছেন। সব ধরনের ফুটবল থেকে অবসরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক এই সফল অধিনায়ক।
আগামী শনিবার (২ মে) পেশাদার ফুটবলার হিসেবে
নিজের শেষ ম্যাচটি খেলবেন তিনি। ঢাকার বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার
লিগের ম্যাচে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস অ্যান্ড সোসাইটির মুখোমুখি হবে মামুনুলের বর্তমান
ক্লাব ফর্টিস এফসি। আর এই ম্যাচটির মধ্য দিয়েই ইতি ঘটবে দেশের ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী
এক ক্যারিয়ারের।
মামুনুল ইসলামের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া
মোটেও সহজ ছিল না। প্রায় ৩০ বছরের ফুটবলীয় জীবনের মায়া কাটিয়ে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিতে
গিয়ে আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন এই মিডফিল্ডার। মামুনুল বলেন, ‘খেলা ছেড়ে দেওয়াটা সব সময় কঠিন। জীবনের
প্রায় পুরোটা সময় ফুটবলের সঙ্গে মিশে আছি। কিন্তু আমাদের মেনে নিতে হবে যে, পৃথিবীতে
যেমন কেউ সারা জীবন বাঁচবে না, তেমনই সারা জীবন খেলে যাওয়াও সম্ভব নয়। এটাই প্রকৃতির
নিয়ম এবং আমি এই নিয়ম মাথা পেতে নিচ্ছি।’
২০০৮ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক
হওয়া মামুনুল লাল-সবুজের জার্সি গায়ে খেলেছেন ৫৯টি ম্যাচ। মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ
এবং ফ্রি-কিক থেকে গোল করায় তার জুড়ি ছিল মেলাভার। বাংলাদেশের ফুটবলের প্রায় সব বড়
ক্লাবেই তিনি নিজের পায়ের ছাপ রেখেছেন। আবাহনী লিমিটেড, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব,
শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মতো ক্লাবে
খেলেছেন তিনি।
২০১৩ সালে শেখ জামালের হয়ে কিংস কাপ জয়
এবং ঘরের মাঠে চট্টগ্রাম আবাহনীর হয়ে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ জয় ছিল তার ক্যারিয়ারের
অনন্য উচ্চতা। এছাড়া প্রথম বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবে ভারতের ইন্ডিয়ান সুপার লিগে (আইএসএল)
আতলেতিকো ডি কলকাতার স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি।
বিদায় বেলায় মামুনুল তার প্রাপ্তির খাতাটি
বেশ গর্বের সাথেই দেখছেন। ক্যারিয়ারে ৬টি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপার পাশাপাশি ফেডারেশন
কাপ ও স্বাধীনতা কাপ জিতেছেন তিনি। তবে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত ছিল ২০১০
দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয়।
এছাড়া ২০১৪ এশিয়ান গেমসে ২৮ বছর পর আফগানিস্তানকে
হারিয়ে বাংলাদেশের জয়ের নায়ক ছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে তার দুর্দান্ত গোলটি এএফসির সপ্তাহের
সেরা গোলের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। প্রাপ্তির ভিড়ে একটি বড় আক্ষেপ মামুনুলকে আজীবন
পোড়াবে। সেটি হলো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা না জিততে পারা। দেশের ফুটবলের অন্যতম
সেরা এই তারকা বলেন, ‘দেশের হয়ে অনেক কিছু পেলেও সাফ ফুটবল জিততে না পারার আক্ষেপটা সারা জীবন
আমার সঙ্গে থেকে যাবে। আমরা কয়েকবার খুব কাছে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছি।’
ফর্টিস এফসির হয়ে গত চার বছর খেললেও কোনো
ট্রফি জেতা হয়নি মামুনুলের। চলতি মৌসুমে লিগ এখনও শেষ হয়নি, তবে তিনি মৌসুমের মাঝপথেই
বুট তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পেছনে কাজ করেছে এক আবেগীয় কারণ। ফর্টিসের কোচ
মাসুদ পারভেজ কায়সার শিগগিরই হজে যাচ্ছেন। মামুনুল চেয়েছিলেন তার প্রিয় এই কোচের উপস্থিতিতেই
ঘরের মাঠে বিদায় নিতে। ২০২০ সালে বুরুন্ডির বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলেছিলেন
মামুনুল।
এরপর জাতীয় দলে অনিয়মিত হয়ে পড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে
লাল-সবুজ জার্সি তুলে রাখার সুযোগ পাননি তিনি। তবে জাতীয় দলের হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলতে
না পারলেও দেশের ফুটবল ইতিহাসে মামুনুল ইসলাম নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দীর্ঘ
সময় ধরে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড হাতে তিনি যেভাবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সংকটের
মুহূর্তে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা
হয়ে থাকবে।
শনিবারের ম্যাচে ফর্টিস এফসির জার্সিতে
শেষবারের মতো মাঠে নামবেন ‘ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাসটিক’। মাঠের দর্শক আর ফুটবল ভক্তরা সেদিন হয়তো অশ্রুসিক্ত
নয়নে বিদায় জানাবেন এক লড়াকু সৈনিককে, যিনি এ দেশের ফুটবলকে ভালোবেসে নিজের জীবনের
সেরা সময়গুলো বিলিয়ে দিয়েছেন সবুজ গালিচায়।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

