দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার পর্দা উঠছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আসর ফিফা বিশ্বকাপের। ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম এই মহাযজ্ঞ যৌথভাবে আয়োজন করছে উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা।
মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে ‘গ্রুপ এ’-এর এই ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই দল। তার আগে একই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের প্রথম জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান আফ্রোবিটস শিল্পী বার্না বয় যৌথভাবে এবারের আসরের অফিসিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’ পরিবেশন করবেন। অনুষ্ঠানে আরও থাকবেন জে বালভিন এবং পপ ব্যান্ড মানার মতো জনপ্রিয় শিল্পীরা।
এবারের উদ্বোধনী ম্যাচ অনেকটা ২০১০ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তির মতো। সেবার উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকো। ১৬ বছর আগের সেই ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। এবার অবশ্য ভেন্যু মেক্সিকোর ঘরের মাঠ। ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকরা খেলবে সেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেই।
মেক্সিকোর রক্ষণভাগকে শক্ত ভিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ওচোয়া রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন। অভিজ্ঞতা ও তরুণদের মিশেলে গড়া দলটি গত ৮ ম্যাচের ৬টিতেই ক্লিনশিট রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, কাউন্টার অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে বিপাকে ফেলতে বেশ পটু দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ৯ ম্যাচের প্রতিটিতেই গোলের দেখা পেয়েছে আফ্রিকার দেশটি।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আয়োজন শুধু মেক্সিকোতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পরদিন বাংলাদেশ সময় রাত একই সময়ে কানাডার টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে দ্বিতীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে পারফর্ম করবেন মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেট এবং আলিসিয়া কারা।
শনিবার (১৩ জুন) ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে বসবে উদ্বোধনী ত্রয়ীর শেষ আয়োজন। হলিউড ঘরানার এই চোখ ধাঁধানো আয়োজনে মঞ্চ মাতাবেন ক্যাটি পেরি, ব্ল্যাকপিংক ব্যান্ডের লিসা, ফিউচার এবং অ্যানিত্তার মতো জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক তারকারা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা যা থাকছে:
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ—মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে—একসঙ্গে আয়োজিত হবে। এই প্রথমবারের মতো একটি বিশ্বকাপ তিন দেশে সমান্তরালভাবে উদ্বোধন করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি আয়োজক দেশে সমান্তরালভাবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতিটি অনুষ্ঠান শুরু হবে সংশ্লিষ্ট আয়োজক দেশের উদ্বোধনী ম্যাচের ৯০ মিনিট আগে। তিনটি অনুষ্ঠান আলাদা হলেও এগুলো একটি অভিন্ন থিমের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে—যেখানে ফুটবলের মাধ্যমে মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে একত্রিত করার বার্তা তুলে ধরা হবে।
অনুষ্ঠানগুলোর প্রযোজক হিসেবে দায়িত্বে আছেন মার্কো বালি। তিনি একাধিক অলিম্পিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিটি শো আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করলেও সবগুলোই ফুটবলের ঐক্যের বার্তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
প্রতিটি দেশ নিজেদের সংস্কৃতি ও ভিজ্যুয়াল পরিচয় তুলে ধরবে—
কানাডা: ‘কালচারাল মোজাইক’ বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য
মেক্সিকো: ঐতিহ্যবাহী ‘পাপেল পিকাডো’ শিল্প
যুক্তরাষ্ট্র: ‘ঝলমলে, উজ্জ্বল’ কাপ থিম
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, ‘বিশ্বকাপের সূচনা এমন একটি মুহূর্ত, যা পুরো বিশ্ব একসঙ্গে ভাগ করে নেয়। মেক্সিকো সিটি থেকে শুরু হয়ে টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসে এই অনুষ্ঠানগুলো অনুষ্ঠিত হবে, যা সংগীত, সংস্কৃতি ও ফুটবলের এক অভিন্ন উদ্যাপন হবে।’
সময় ও স্থানভিত্তিক আয়োজন
মেক্সিকো সিটি (১১ জুন)
মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে স্বদেশীয় সংস্কৃতি, আধুনিক লোকশিল্প এবং ‘পাপেল পিকাডো’ প্রদর্শিত হবে। এতে শাকিরা, জে বালভিন, মানা, লিলা ডাউনসসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী অংশ নেবেন।
টরন্টো (১২ জুন)
কানাডার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। এখানে দেশটির বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক মিশ্রণ তুলে ধরা হবে। এতে পারফর্ম করবেন আলানিস মরিসেট, মাইকেল বুবলে, এলেসিয়া কারা, জেসি রেইজস, নোরা ফাতেহি, সঞ্জয়সহ অনেকে। এটি কানাডার জন্য ঘরের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হবে।
লস অ্যাঞ্জেলেস (১২ জুন)
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে। এতে থাকবে বৃহৎ ভিজ্যুয়াল শো এবং কেটি পেরি, ফিউচার, আনিতা, এলএলএ ও রেমার মতো প্রমুখ শিল্পিদের পারফরম্যান্স।
প্রতিটি অনুষ্ঠানের পর মাঠে খেলোয়াড়দের ওয়ার্ম-আপ, প্রি-ম্যাচ অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিক কিক-অফ প্রোটোকল সম্পন্ন হবে।
মেক্সিকো সিটির অনুষ্ঠান প্রায় ১৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ড, আর টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের অনুষ্ঠান প্রায় ১৩ মিনিট করে চলবে।
সবশেষে ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে এই বিশ্বযুদ্ধের।
৩৯ দিন আর ১০৪ ম্যাচের মহাযজ্ঞ শেষে ফুটবল দুনিয়া পাবে নতুন এক রাজা।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

