গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের বলয়ে আফ্রিকার গ্রেট লেকস অঞ্চল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৮:৩৫

ছবি : সংগৃহীত
আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব ও মধ্য অংশে অবস্থিত গ্রেট লেকস অঞ্চল আজও রক্তপাত ও অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের জটিল জালে জড়িয়ে থাকা এই অঞ্চলকে ঘিরে চলছে ক্ষমতার লড়াই। আফ্রিকার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতায় একদিকে রয়েছে বহিরাগত শক্তিগুলো, অন্যদিকে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও দুর্বল সরকারগুলো। ফলে অস্থিরতা দিনদিন আরও প্রকট হচ্ছে।
গ্রেট লেকস অঞ্চলটি আফ্রিকার প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এটি প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। এখানকার প্রধান হ্রদগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিক্টোরিয়া হ্রদ (৫৯,৯৪৭ বর্গ কিলোমিটার), টাঙ্গানিকা হ্রদ (৩২,০০০ বর্গ কিলোমিটার), মালাউই হ্রদ (২৯,৬০০ বর্গ কিলোমিটার), আলবার্ট হ্রদ (৫,৫৯০ বর্গ কিলোমিটার), কিভু হ্রদ (২,৭০০ বর্গ কিলোমিটার) ও এডওয়ার্ড হ্রদ (২,৩২৫ বর্গ কিলোমিটার)। এই অঞ্চল ঘিরে রয়েছে ১০টি দেশ—বুরুন্ডি, ডেমোক্র্যাটিক কঙ্গো রিপাবলিক (ডিসিআর), ইথিওপিয়া, কেনিয়া, মালাউই, মোজাম্বিক, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া, উগান্ডা ও জাম্বিয়া।
এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর ভূকৌশলগত অবস্থানও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নজর কাড়ে। এখানকার খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে তেল, স্বর্ণ, হীরা, ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজ পদার্থ।
এই অঞ্চলের অনেক দেশেরই দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও ডিসিআর বারবার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শিকার হয়েছে।
রুয়ান্ডার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় ছিল ১৯৯৪ সালের গণহত্যা। জার্মান ও বেলজিয়ান উপনিবেশিক শক্তির জাতিগত শ্রেণিবিভাগের নীতি হুটু ও টুটসি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। এই বিভেদের জের ধরেই হুটু পরিচালিত সরকার টুটসিদের নির্মূল করতে শুরু করে। মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে প্রায় আট লক্ষ মানুষ নিহত হয়। যা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। পরবর্তী সময়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠী রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ) ক্ষমতায় এসে রুয়ান্ডাকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে।
বুরুন্ডির জাতিগত সংঘাতও কয়েক দশক ধরে চলে আসছে। ১৯৭২ সালে প্রথম গণহত্যার ঘটনা ঘটে, যেখানে টুটসি নেতৃত্বাধীন সরকার হুটু বিদ্রোহীদের নির্মমভাবে দমন করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ চলে, যা দেশটিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
ডিসিআর-এর সংঘাতকে ‘আফ্রিকার বিশ্বযুদ্ধ’ বলা হয়। ১৯৯৬ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ৫০ লক্ষেরও বেশি মানুষের প্রাণ নিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ডিসিআর-এর গুরুত্বপূর্ণ শহর গোমা দখল করে ‘এম২৩’ বিদ্রোহীরা। রুয়ান্ডার সমর্থন পাওয়া এই বিদ্রোহীদের তৎপরতা নতুন করে সংঘাতের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
এদিকে, আফ্রিকার বিপুল সম্পদ দখলের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের মতো বিশ্ব শক্তিগুলো নানা কৌশলে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার অজুহাতে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব। চীন আফ্রিকায় ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। খনিজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে নিজের কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করছে। রাশিয়া সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে। তুরস্ক আফ্রিকায় বাণিজ্য ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে নিজের কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
গৃহযুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও ডিসিআর-এ শরণার্থী সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। লাখ লাখ মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাত নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে গ্রেট লেকস অঞ্চল আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে। জাতিগত বিভাজন, সম্পদ লুণ্ঠন ও বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ এই অঞ্চলকে শান্তির পরিবর্তে নতুন নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এমজে