Logo

মতামত

রাজনীতির জটিল মঞ্চে সরল তারুণ্য

Icon

নিয়ন মতিয়ুল

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১১:১৭

রাজনীতির জটিল মঞ্চে সরল তারুণ্য

বাংলাদেশের প্রবাহমান রাজনীতির চরিত্র, প্রকৃতি বিশ্রী রকমের জটিল, কুটিল। কখনো কখনো আপেক্ষিক তত্ত্বের চেয়েও দুর্বোধ্য, কোয়ান্টাম তত্ত্বের মতো প্যারাডক্সে ভরপুর। এমন বহুমুখী জটিল রাজনীতিতে ‘একীভূত তত্ত্ব’ আবিষ্কারের চেষ্টায় দশকের পর দশক ধরে আমরা প্রাণপাত করে চলেছি। সব সমীকরণ মিলিয়ে কুটিল এই রাজনীতির ‘থিওরি অব এভরিথিং’ (অন্তর্ভুক্তিমূলক) তত্ত্বের সন্ধান করা সত্যিই দুঃসাধ্য। প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার।

দেশীয় রাজনীতির এমন বাস্তবতার মধ্যেই সময়ের দাবিতে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন আমাদের নতুন প্রজন্ম, চব্বিশের টগবগে বিপ্লবীরা। দারুণ উদ্দীপনায় স্বপ্ন আর সম্ভাবনাকে সঙ্গী করে অবশেষে তারা নেমেও পড়েছেন ‘দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত’ মাঠের রাজনীতিতে। বহুত্ববাদী অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা অসম্ভব যাত্রাও শুরু করেছেন।

কয়েক দশক ধরে রাজনীতির প্রশ্নে নীরব থেকে চব্বিশে হঠাৎ জ্বলে উঠে বিশ্বের বিস্ময় রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লব ঘটানো অদম্য তরুণদের নিয়ে গোটা জাতি এখনো ভাসছে আবেগে। প্রচলিত লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বদলে জনমনে তৈরি হয়েছে বহুসংস্কৃতিবাদের আকাঙ্ক্ষা। তবে সম্মিলিত সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তরুণদের মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই যথারীতি উল্টো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কুটিল রাজনীতির জটিল সব সমীকরণ আবিষ্কারের চেষ্টায় প্রজন্মকে নিয়ে আসা হচ্ছে ঘৃণা আর বিভাজনের রাজনীতির শক্তিশালী বাইনারি লেন্সের স্লাইডে।

ইতিহাসের পথ বেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ভিত্তি মূলত রক্ত আর ঘৃণাবাদ। ভূ-বৈচিত্রের প্রভাবে আবেগী জাতি হওয়ার কারণে যৌক্তিকবোধের চেয়ে রাজনীতির মঞ্চে আমরা ষড়যন্ত্রতত্ত্বেই বেশি আসক্ত। শতকের পর শতক ধরে বহিঃশক্তির শাসন-শোষণে যেমন আমাদের বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তেমনি সরল আবেগের বিচ্যুতি-বিকৃতিও ঘটেছে। জিনের ভেতরে হীনমন্যতার সঙ্গে ঘৃণা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা আর বিশ্বাসঘাতকতার বীজও বপন করেছি যুগের পর যুগ ধরে। সেই বীজ পরিণত হয়েছে আজ বয়সীবৃক্ষে।

ফলে সমকালে বিশ্ব যখন সভ্যতার সর্বোচ্চ চূড়ার সন্ধানে ব্যস্ত, তখন আমরা সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কখনো ক্ষমতার লোভে, কখনো-বা ব্যক্তিস্বার্থে বিরুদ্ধ মতাদর্শকে নিশ্চিহ্ন করার খেলায় মেতে আছি। রক্ত আর ঘৃণাবাদের রাজনীতির বিস্ময়কর এই মেশিনে ঢুকে পড়লেই দেবতারা পরিণত হন ভয়ঙ্কর ডেভিলে আর ডেভিলরা মুহূর্তেই পরিণত হয়ে যান দেবতায়।

দেশীয় রাজনীতির বিষময় বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েই বেড়ে উঠেছে আমাদের আজকের প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণ প্রজন্ম।  দশকের পর দশক ধরে তারা রাজনীতির বিষে নীল হয়েও ছিলেন নীরব। মাঝে মাঝে গর্জে উঠলেও ঘটেনি কাঙ্ক্ষিত বর্ষণ। সুন্দর আগামীর জন্য তাই তারা মানচিত্রহীন বিশ্বের দিকে ছুটেছেন। তবে দিনে দিনে পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে, বেড়ে গেছে বহু দেনা। ঋণ শোধ করার জন্য মরিয়া হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। চব্বিশের বিপ্লব পেরিয়ে তাই তারা এবার সোজা নেমে গেলেন রাজনীতির ময়দানে।

তবে শুধু তাত্ত্বিক পড়ালেখা ছাড়া রাজনীতিতে একেবারে অনভিজ্ঞ, আনকোরা বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের মাঠে নামার এই ঘটনায় ইতোমধ্যে সমালোচনা, তর্ক-বিতর্কের সুনামি শুরু হয়েছে। নির্মম ঠাট্টা-বিদ্রুপে মেতে উঠেছেন অনেকে।  তালিকায় রয়েছেন গণমাধ্যমের বিশেষজনেরাও। তাদের ভাষ্য, অভিজ্ঞতা ছাড়া রাজনীতিতে এসে এসব আবালরা কী করবে? কার, কী উদ্ধার করবে?

ঘটনাটা বেকারদের ইন্টারভিউয়ের মতো অনেকটা। যেখানে চাকরিদাতারা সাফ বলে দেন, ‘আগে অভিজ্ঞতা আনেন, তারপর চাকরি পাবেন’। শুনে বেকাররা পড়ে যান গোলকধাঁধায়। একটা চাকরি না পেলে অভিজ্ঞতাটা অর্জন হবে কী করে? জলের মতো সরল এই বিষয়টা কেন যে চাকরিদাতারা বুঝতে চান না- মাথায় ঢোকে না বেকারদের। ফলে ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’র মতো জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি পড়তে হয় অনভিজ্ঞ বেকারদের।

নতুন কোনো রাজনৈতিক দলের আলাপ শুরু হলেই সবার আগে হামলে পড়েন দলদাস বুদ্ধিবিক্রেতারা। শুরু করেন নির্মম কটাক্ষ। তরুণদের দমিয়ে রাখার জিঘাংসা প্রবণতায় লিপ্ত হন। জানতে চান, রাজনীতির মাঠে খেলতে আসা তরুণরা কোন তরিকার, কী তাদের বয়ান, পূর্বপুরুষের নাম কী? এসব বুদ্ধিবিক্রেতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুখর থাকেন দলান্ধ খবরবিক্রেতারা। ভ্রু কুঁচকে তারা জানতে চান, পেছনে কারা? কোথাকার ফান্ড? নতুন দোকান না কি? যান না ভোটের মাঠে, বুঝবেন তখন কত গমে কত আটা!

বলতে কী, প্রচলিত ধারার দলগুলোকে ঈশ্বরপ্রদত্ত আর শীর্ষ নেতাদের দেবতাতুল্য জ্ঞান করে রাজনীতিকে ট্যাবু বানিয়েছেন অতীতমুখী বুদ্ধিবিক্রেতারা। মূলধারার দলগুলোও ফুল-চন্দন, পূজা পেয়ে জগদ্দল পাথরের মতো গেড়ে বসেছে সমাজে, রাষ্ট্রের দেহে। যারা দলীয় নেতাকর্মীদের ভাবেন জনগণ, রাষ্ট্রের মালিকদের বানান দাস। বিপরীতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়ে যান শাসক-প্রশাসকের উচ্চতায়।

শুধু তাই নয়, রাজনীতির দেবতারা জনগণকে ভেড়ার পাল বানাতে সবার আগে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন। সমাজে ভয় আর ত্রাস সৃষ্টি করতে তালিকাভুক্ত অপরাধীদের বানিয়েছেন বড়সড় নেতা। ক্ষমতা আর অর্থের প্রলোভনে বুদ্ধিবিক্রেতাদের মেরুদণ্ডহীন প্রাণীতে পরিণত করেছেন। সম্মোহনযোগ্য বয়ান তৈরি করে তা জনগণকে গিলিয়ে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের সম্পদ ভাগবাটোয়ারা বন্দোবস্ত এমন ডিজাইনে করা হয়েছে, যেখানে জবাবদিহিতার কোনো ফাঁকফোকর নেই। রাজধানী থেকে পল্লী কোটি কোটি এজেন্সি তৈরির মাধ্যমে রাজনীতিকে পরিণত করা হয়েছে ক্ষমতা, অর্থ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের আলাদিনের চেরাগের বিস্ময়কর ব্যবসায়।

এমন ব্যবসামুখী জটিল রাজনীতির সুবিধাভোগীরা কখনোই চান না প্রচলিত ধারার দলগুলোর কোনো সংস্কার আসুক। চান না তারুণ্যের হাত ধরে বিশুদ্ধ মডেলের রাজনীতির চর্চা হোক। কারণ, আদর্শহীন, নীতিবিবর্জিত মাফিয়া মডেলের রাজনীতির হাত ধরেই লাখ লাখ নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, মাস্তান, চাঁদাবাজ, দখলবাজ বিনাপুঁজিতে দু’হাত ভরে আয় করছেন। সমাজের নিম্নস্তর থেকে উঠে আসার সুযোগ পাচ্ছেন উচ্চস্তরে। ছোট চেয়ার ছেড়ে বসতে পারছেন বড় চেয়ারে। রাজনীতির এই মডেলের ওপর দাঁড়িয়েই চোখের পলকে ভাগ্য বদলাতে পারছেন মাফিয়ারা।

এমন বাস্তবতায় মুনাফাভিত্তিক গদিমুখী রাজনীতির মাঠে আত্মপ্রকাশ করা তরুণদের দল যে ষড়যন্ত্রের মুখে পড়বে, আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হবে সেটা অবধারিত। দশকের পর দশক ধরে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ সিস্টেমে শাসন করা প্রচলিত অপরাজনীতি যে তারুণ্যের বিশুদ্ধ রাজনীতিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করবে- সেটা অস্বাভাবিক নয়। ইতোমধ্যে প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। যাতে উল্লসিত হয়ে পড়েছেন প্রতিপক্ষ শক্তি। যার ঢেউ আছড়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

অবশ্য, এমন জটিল বৈরী পরিস্থিতিতেও তরুণরা তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন। তারা বলছেন, তারুণ্যের রাজনীতি এলিট হবে না। একক নেতা বা পরিবারের কোনো প্রভাবও থাকবে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ যোগ্যতা আর দক্ষতার ভিত্তিতে আসতে পারবেন নেতৃত্বে। থাকবে না বংশপ্রীতি, অঞ্চলপ্রীতি, নির্দিষ্ট আদর্শপ্রীতি। দল হবে সব মানুষের কণ্ঠস্বর। তারা দেশের মানুষের নানান পথ আর মতকে ধারণ করবেন। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে তাদের দলের লক্ষ্য হবে, সাম্য, ন্যায়বিচার আর সুশাসন।

রাজনীতির আধুনিকায়নে তরুণদের এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা এখন বাম, ডান, মধ্য বা উদার ধারার বড় দলগুলো। যেকোনোভাবে তরুণদের তারা ঠেকিয়ে দেবে। যারা দশকের পর দশক ধরে রাজনীতিকে মাফিয়া মডেলে গড়ে তুলে উপহার দিয়ে গেছে দিকভ্রান্ত, অবক্ষয়ী এক সমাজবাস্তবতা। সরকারকে পরিণত করেছে রাজনৈতিক দলে।  রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানের মৌলিক কাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে অবলীলায়। দৃশ্যমান উন্নয়নের গোটা মডেলটাই তারা বানিয়েছে প্রকল্পের মোড়কে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের লক্ষ্যে। যত বড় অবকাঠামো ততবেশি লুটপাট-এমন দর্শনে দেশে শুধু চোখ ধাঁধানো অবকাঠামোই তৈরি হয়েছে, মানুষ বা সমাজ তৈরি হয়নি।

এমন দুঃসহ সামাজিক, রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির চাপেই বিগত সময়ে রুচিশীল, সুশিক্ষিত, শান্তিপ্রিয় মানুষেরা দেশের মায়া ছেড়ে ক্রমাগত বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। মেধাবীরাও ছুটেছেন উন্নত জীবনের টানে উন্নত দেশগুলোতে। ভিটেমাটি বিক্রি করে কর্মসংস্থানের আশায় বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের লাখ লাখ বেকার। বিদেশি ঋণের জালে দেশ যখন এভাবে আকণ্ঠ ডুবতে শুরু করেছে, সেই বৈরী ঝড়ের মধ্যেই তরুণদের বিশাল একটি অংশ অদম্য হয়ে উঠেছেন। শত বাধা পেরিয়ে হেঁটেছেন সামনের দিকে।

অদম্য সেই তরুণদের বাবা-মায়ের বাস প্রান্তিকে, সমাজের একেবারে পেছনের সারিতে। যাদের মধ্যে কেউ রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, মুদি দোকানি, ফেরিওয়ালা, কেউ আবার শ্রমবিক্রেতা। এসব লৌহকঠিন সংগ্রামীদের ঘর থেকেই বেরিয়ে এসেছে লাখ লাখ, কোটি কোটি অদম্য ‘ফুলপরী’। যারা ভয়ের সংস্কৃতি রুখে দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদের প্রতীক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর অদম্য ফুলপরীদের সাহসে ভর দিয়েই ভেঙে পড়া রাষ্ট্রসংস্কারে আজকের বিপ্লবী তারুণ্যের আগমন। যারা চব্বিশের বিপ্লবে অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। বিশ্ব ইতিহাসে ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান, গণবিপ্লবের জন্ম দিয়েছে।

ইতিহাসের বিস্ময় এই তারুণ্যের হাত ধরেই দেশে অভিজাততন্ত্রের ছায়ায় বেড়ে ওঠা মাফিয়া রাজনীতির অবসান ঘটবে। উন্মোচিত হবে সুস্থ, রুচিশীল, অদম্য তারুণ্যে ভরপুর সর্বজনীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন এক দিগন্ত। হাজারো ষড়যন্ত্র আর বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা হবে নতুন নেতৃত্ব। নিশ্চিত হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসন।  সমতার ভিত্তিতে প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে। সংবিধানের জন্য জনগণ নয়, জনগণের জন্যই হবে সংবিধান। এমন স্বপ্ন আর সর্বজনীন জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন একমাত্র অদম্য তারুণ্যের মাধ্যমেই হতে পারে। এটা এখন বিশ্বাস নয়, বাস্তবতা।

  • লেখক : সাংবাদিক
Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর