-679b0e4ccbd44.jpg)
এটা তথ্যপ্রযুক্তির যুগ, যেখানে সারা বিশ্বে তথ্যই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। একসময় বলা হত, ‘অর্থই সব কিছু’, অর্থ ছিল সবকিছুর মূল এবং তা দিয়েই ক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব ছিল। তবে আধুনিক যুগের আসন্ন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিশেষত তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব, সেই পুরোনো ধারণাকে একেবারেই বদলে দিয়েছে। আজকের দিনে, অর্থের প্রভাব এখনো আছে, কিন্তু তার তুলনায় তথ্যের শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি ও তথ্যের অগ্রগতি বর্তমান সমাজের অভ্যন্তরে নতুন এক দ্বার উন্মুক্ত করেছে। আজকের দিনে একটি তথ্যের টুকরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা পৃথিবীতে। প্রযুক্তির এই শক্তিশালী প্রভাব কেবল বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মানুষের জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই এক নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। এখন শুধু আইটি বিশেষজ্ঞ নয়, সাধারণ মানুষও তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তা বদলাতে সক্ষম। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ—এসব প্ল্যাটফর্মে তথ্য শেয়ার করতে পারার কারণে আজ প্রতিটি ব্যক্তির একধরনের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যা অর্থের সাহায্যে সম্ভব ছিল না।
তথ্যের শক্তি কেবল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই প্রভাবিত করছে না, বরং রাষ্ট্রগুলোও এর মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা বা প্রভাব বৃদ্ধি করছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামো অনেকাংশে তথ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সরকারগুলো সমাজের নানা স্তরের মানুষের অবস্থা বুঝে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধান, উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—সবই এখন তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে হয়ে থাকে। তথ্যের উপযোগী ব্যবহার এখন রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের মূল হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে তথ্যের অগাধ ভাণ্ডার মানুষকে আগের তুলনায় আরও স্মার্ট, গতিশীল ও সৃজনশীল করেছে। এখন সবাই হাতে হাতে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এক সময় পণ্য বা সেবা বিক্রির জন্য বড় বড় অর্থব্যয় করতে হতো, কিন্তু এখন ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে খুব কম খরচে একটি কোম্পানি তার পণ্য বা সেবা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একদিকে যেখানে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারছে, অন্যদিকে বড় বড় ব্যবসাও প্রযুক্তির মাধ্যমে তার কার্যক্রমের প্রসার ঘটাচ্ছে।
তবে তথ্যের বিপ্লবের সাথে সাথে কিছু চ্যালেঞ্জও এসেছে, বিশেষত মিথ্যা তথ্য বা ফেক নিউজের বিস্তার। তথ্যের জগতের এই অপব্যবহার সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, যা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত জীবন বা সামাজিক সংগতি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। তাই শুধু তথ্যের দিকেই নয়, তার সঠিক ব্যবহার এবং যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা তৈরিও জরুরি। প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই এর প্রতি আমাদের সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আইন এবং সমাজের প্রচলিত নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তথ্যের সঠিক ব্যবহার সমাজে একটি প্রগতিশীল এবং সমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তথ্যের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, পরিবেশ সংরক্ষণ, মানবাধিকার, এবং শিক্ষা সহায়তার ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এখন যে কোন দেশের নাগরিক তাদের ক্ষুদ্রতম তথ্যও বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দিতে পারে, এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে নানা ধরনের গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
তথ্য প্রযুক্তির যুগে মানুষের ক্ষমতা অর্থের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে, তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। তথ্যের শক্তি অসীম, এবং তা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে এটি সমগ্র পৃথিবীকে একটি নূতন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সহায়তা করবে। সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য উন্নয়ন—এই সব ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবী অনেক ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। তবে এজন্য আমাদের প্রয়োজন হবে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে তথ্যের শক্তি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটা জানার।
অতএব, তথ্য এখন কেবল একটি সহায়ক উপাদান নয়, বরং এটি বর্তমান সমাজের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির শক্তি, সঠিক তথ্যের সাথে মিলিত হলে ভবিষ্যতের পৃথিবী অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং আধুনিক হতে পারে।
সুদীপ্ত শামীম : কলামিস্ট, গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠক
- বাংলাদেশের খবরের মতামত বিভাগে লেখা পাঠান এই মেইলে- [email protected]