ডিএসসিসির বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিসুর বদলি ঠেকাতে তৎপর
তিন প্রতিষ্ঠানকে পার্ক নির্মাণে ৪০০ কোটির কাজ দিতে মরিয়া
এম. ইসলাম
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৪
ছবি: সংগৃহীত
তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার পার্ক নির্মাণ কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে বিশেষ শর্ত সংযোজনের অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিসুর রহমানকে বদলি করা হলেও তিনি তা ঠেকাতে মরিয়া। এই টেন্ডারে তিনি এমন সব শর্ত নির্ধারণ করেছেন যাতে অধিকাংশ যোগ্য ঠিকাদার প্রতিযোগিতা থেকে কার্যত ছিটকে পড়ে এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গত ৩০ জুন দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে বগুড়া সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছে। বদলির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব রবিউল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সিটি করপোরেশন-১) আশফিকুন নাহার স্বাক্ষরিত পত্রে আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ‘দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, টেন্ডারে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক স্থানীয় সরকার বিচারের সচিবের কাছে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’
কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এখনো রিলিজ না নিয়ে বদলি ঠেকানোর জন্য কোটি টাকা নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করছেন আনিসুর রহমান।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুরোনো। ইতোমধ্যে তাকে এখান থেকে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন রিপোর্ট আসলে বাকি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বদলি ঠেকাতে দৌড়ঝাঁপের বিষয়ে তিনি বলেন, কারো অসুখ হলে ডাক্তার দেখাবে এটা যেমন স্বাভাবিক তেমনি তার বদলি ঠেকাতে সে একটু দৌড়ঝাঁপ করবে সেটাও স্বাভাবিক।
উপসচিব রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা তদন্ত কাজ শুরু করেছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবো।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আনিসুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার কার্যালয়ে না গেলে বক্তব্য দেবেন না বলে জানান। তার কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগসমূহের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে চাননি। তিনি বলেন, আপনারা জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পার্ক নির্মাণ কাজে বিশেষ শর্তারোপ: ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক (সাবেক জিয়া শিশু পার্ক) পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান করা টেন্ডারে আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাপ্রাপ্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÑ এনডিই, ইউসিসি এবং ওরিয়ন গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনের বড় বড় প্রকল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল এবং নিজেদের অনুকূলে প্রকল্পের শর্ত নির্ধারণ করে কাজ বাগিয়ে নিতো।
বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী টেন্ডার জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৫ জুলাই এবং দরপত্র খোলা হবে ১৭ জুলাই। যদিও প্রথম দফায় জুনের শেষ সপ্তাহেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। একাধিক আপত্তি ও বাধার মুখে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আনিসুর রহমান নিজ উদ্যোগে সময়সূচি পরিবর্তন করে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দরপত্রের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পার্কের বিনোদন রাইডগুলোর কারিগরি স্পেসিফিকেশন ইতালির বিখ্যাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জামপেলা-এর নির্দিষ্ট কয়েকটি মডেলÑ ডিসকো ৪০, এন্ডেভার, গ্যালিয়ন ও ওয়াটার ম্যানিয়ার সঙ্গে প্রায় হুবহু মিল রেখে তৈরি করা হয়েছে। কাগজে-কলমে সমমানের পণ্য সরবরাহের সুযোগ রাখা হলেও বাস্তবে ধারণক্ষমতা, আকার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অন্যান্য মানদণ্ড এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যান্য প্রস্তুতকারকের পণ্য কার্যত অযোগ্য হয়ে পড়ে।
এছাড়া নির্দিষ্ট প্রস্তুতকারকের একচেটিয়া অনুমোদনপত্রের শর্ত আরোপের কারণে অন্যান্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাচ্ছে।
শুধু তাই নয়, একই ধরনের পার্ক নির্মাণে অন্তত দুটি কার্যাদেশে ২২০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং উচ্চ আর্থিক সক্ষমতার মতো শর্তও আরোপ করা হয়েছে। টেন্ডারে আগ্রহী একাধিক প্রতিষ্ঠানের দাবি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাপ্রাপ্ত হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া এসব শর্ত পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হচ্ছে।
আনিসুরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পুরোনো: আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে বিল জালিয়াতি, মালামাল সরবরাহ ছাড়াই অর্থ পরিশোধ, ভুয়া রোড মার্কিং দেখিয়ে বিল উত্তোলনসহ একাধিক অভিযোগে তিনি আলোচনায় আসেন এবং বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন।
ডিএসসিসির নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ‘সাপ্লাই জেনসোলিন অ্যান্ড থার্মোপ্লাস্টিক পেইন্ট’ প্রকল্পে মালামাল সরবরাহ ছাড়াই দুই কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং এক কোটি ৫৫ লাখ টাকার বিল পরিশোধের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিধি অনুযায়ী বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর কথা থাকলেও তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের প্রভাবে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ‘সাপ্লাই পোর্টেবল এয়ার কম্প্রেশার-২’ এবং ‘সাপ্লাই ব্র্যান্ড নিউ বিটুমেন প্রেশার ডিস্ট্রিবিউটর’ শীর্ষক দুটি কাজে চুক্তির শর্ত পূরণ না করেই পাঁচ কোটি ২৪ লাখ টাকার বিল ব্যাকডেটে পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ডিএসসিসির আরেক নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই প্রকল্প পরিচালক আনিসুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট দুই প্রকৌশলীকে বিভিন্ন স্থানে রোড মার্কিংয়ের কাজ সম্পন্নের প্রমাণসহ লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। তারা ব্যাখ্যায় কাজ সম্পন্নের দাবি করলেও পরিদর্শনে ওই রোড মার্কিংয়ের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এরপর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান আনিসুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।
সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতি বা অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে প্রধানত দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪, দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব আইনে দুদক তদন্ত ও মামলা করতে পারে, আর অপরাধ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড, জরিমানা এবং বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের বিধান রয়েছে। কিন্তু তারপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সরকার পতনের পরও তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ: ১৯৯৫ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়া আনিসুর রহমান সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামসুল হক ভুঁইয়ার ভাগ্নে হওয়ার সুবাদে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৫ সালে চাকরি ছেড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া শামসুল হক ভুঁইয়া পরবর্তীতে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। অভিযোগ রয়েছে, মামা-ভাগ্নে মিলে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে দীর্ঘদিন সিটি করপোরেশনের কাজ বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ধারাবাহিকভাবে বড় বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাতে আসা নথি অনুযায়ী, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মোথাজুরী ইউনিয়নে আনিসুর রহমানের নামে ১৪৫ শতক ৫৫ শতাংশ জমি রয়েছে। সেখানে তিনি বাগানবাড়ি ও ‘কুমকুম মাল্টিপারপাস এগ্রো ফার্ম’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। বর্তমানে এসব সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টাও করছেন বলে জানা গেছে।
ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানান, তার দেশের থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পতি বিক্রি করে দিতে চায় আনিসুর রহমান। ইতোমধ্য কয়েকটি জায়গায় সম্পত্তি বিক্রি করে কানাডায় থাকা মেয়ের নামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি দ্রুত সময়ের বাগান বাড়ি বিক্রি করতে পারলে কানাডায় চলে যাবেন।
এদিকে ডিএসসিসিতে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের আমলে গড়ে ওঠা প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবেও বিভিন্ন সময়ে আনিসুর রহমানের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করা হতো। শুধু তাপসের আমলেই নয়, সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের সময়ও তিনি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

