এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হওয়া লক্ষ্য
মোটরসাইকেলের সামনেও বসবে নম্বর প্লেট
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪২
ছবি: সংগৃহীত
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী মোটরসাইকেলকে শনাক্ত করতে সামনে নম্বর প্লেট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরায় মোটরসাইকেলের নম্বর যেন সহজে শনাক্ত হয় সেই লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক সভায় মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ)।
তবে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু কারিগরি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশে চলাচলকারী অনেক মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বর প্লেট বসানোর নির্দিষ্ট জায়গা নেই। ফলে নতুন করে প্লেট সংযোজন করলে মোটরসাইকেলের নকশা, বায়ুপ্রবাহ ও নিরাপত্তায় কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত দিতে গত ১৩ আগস্ট সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিআরটিএ। কমিটিকে নম্বর প্লেটের আকার, সংযোজনের স্থান এবং এআই ক্যামেরায় সেটি কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব কি না—এসব বিষয় যাচাই করতে বলা হয়েছে।
কমিটিতে বিআরটিএ, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মোটরসাইকেল উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
বর্তমানে মোটরসাইকেল ছাড়া অন্যান্য যানবাহনে সামনে ও পেছনে নম্বর প্লেট থাকে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার। প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ নতুন মোটরসাইকেল বিক্রি হয়।
মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে চালক, বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ও বর্তমান মডেলের মোটরসাইকেলে কীভাবে প্লেট বসানো হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উত্তরা মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, সামনে ও পেছনে দুটি নম্বর প্লেট বসানোর কথা জানানো হলেও প্লেটের আকার বা নির্দিষ্ট মাপ সম্পর্কে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
খাতসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক মোটরসাইকেলে সামনে প্লেট বসানোর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। ফলে সেগুলোতে পরিবর্তন আনতে হতে পারে। এতে মোটরসাইকেলের সামনের অংশে বাতাসের চাপ বাড়লে উচ্চগতিতে নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার হেডলাইটের নিচে বা রেডিয়েটরের সামনে প্লেট বসালে ইঞ্জিনে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়ে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ ছাড়া রাস্তায় চলাচলকারী পুরোনো সব মোটরসাইকেলে সামনে প্লেট বসানো হবে, নাকি শুধু নতুন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এ নিয়ম কার্যকর হবে—এ বিষয়টিও এখনো পরিষ্কার নয়।
ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম শুরু হয়।
এআইভিত্তিক ক্যামেরায় সড়ক পরিবহন আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার সফটওয়্যার যুক্ত করা হয়েছে। কোনো যানবাহন আইন ভাঙলে ক্যামেরার মাধ্যমে তা শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের নামে ডিজিটালভাবে মামলা করা হচ্ছে।
এ কাজে বর্তমানে ‘পিটিজেড ক্যামেরা’ ব্যবহার করছে পুলিশ। এসব ক্যামেরা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ছবি ও ভিডিও ধারণের পাশাপাশি চলন্ত যানবাহন শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে।
তবে সড়ক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু সামনে নম্বর প্লেট বসিয়ে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহন শনাক্তের সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন বা আরএফআইডি প্রযুক্তি আরও কার্যকর হতে পারে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, প্রতিটি গাড়িতে আরএফআইডি চিপ থাকলে দূর থেকেই সেটি শনাক্ত করা সম্ভব। কোনো গাড়ির নম্বর প্লেট কাপড় বা ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা গেলেও রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে কাজ করা আরএফআইডি ট্যাগ সহজে আড়াল করা যায় না। আরএফআইডি প্রযুক্তিতে গাড়ির সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ ট্যাগে থাকা স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর রিডারের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। সড়ক, টোল প্লাজা বা প্রবেশপথে থাকা রিডার গাড়িটি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে পাঠাতে পারে। এর মাধ্যমে গাড়ির পরিচয় ও চলাচলের সময়ও সংরক্ষণ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতুতে টোল আদায়ের ক্ষেত্রেও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সড়ক ব্যবস্থাপনায় আরএফআইডির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে যানবাহন শনাক্তকরণ ও আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

