হরিরামপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
হাজিরা দিয়ে ‘চলে যান’ চিকিৎসক-কর্মচারীরা, নেয়ে-খেয়ে পরে আসেন!

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৮:২৯

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সময়মতো আসেন না চিকিৎসক ও কর্মচারীরা। রোগীদের অভিযোগ, অফিস সময় না মেনে নিজেদের ইচ্ছেমতো হাসপাতালে আসেন তারা। এতে ভোগান্তি পোহাতে হয় চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের। হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকা অনেকেই সকালে এসে সময়মতো হাজিরা দিয়ে চলে যান। পরে গোসল, খাওয়া-দাওয়া করে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে আবার আসেন তারা।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগের ভবনের দেয়ালে সিটিজেন চার্টারে লেখা রয়েছে, বহির্বিভাগের সেবা সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত। অথচ আউটডোর ভবনের গেট খোলা হয় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে। ৮টা ৪৮ মিনিটে ফার্মেসি খোলেন ফার্মাসিস্ট বীরেন্দ্র কুমার মন্ডল।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে ঘুরছিলেন অফিস সহকারী সাইদুর রহমান। সাংবাদিকদের দেখে তড়িঘড়ি করে পোশাক পরিবর্তন করে ৮টা ৫৩ মিনিটে টিকিট কাউন্টার খোলেন তিনি। অভিজ্ঞ না হওয়ায় টিকিট ঠিকমতো দিতে পারেন না। ফলে কাউন্টারে ভিড় পড়ে যায়।
সাইদুর রহমান বলেন, ‘টিকিট কাউন্টারে যিনি বসেন তিনি ছুটিতে আছেন। প্রিন্টারে সমস্যার কারণে হাতে লিখে টিকিট দিচ্ছি।’
সাইদুরের মাধ্যমে সাংবাদিক আসার খবরে তড়িঘড়ি করে আসতে থাকেন কোয়ার্টারে থাকা চিকিৎসক ও কর্মচারীদের অনেকে। ৮টা ৪১ মিনিটে আউটড্রেস পরে হাজিরা (ফিঙ্গার) দেন নার্স ঝর্ণা আক্তার। ৮টা ৪২ মিনিটে তড়িঘড়ি করে আসেন অফিস সহায়ক মো. রজ্জব আলী খান। ৮টা ৫৫ মিনিটে ১১২ নং রুমে রোগী দেখতে আসেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘নরমালি নয়টার মধ্যেই আসে সবাই।’
সকাল ৯টা ৩ মিনিটে আসেন হারবাল সহকারী মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘একটা চিঠি ছিল। আনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে।’ ৯টা ১৪ মিনিটে মেডিকেল অফিসারের রুমে আসেন ডা. কাবেরী দাস। তিনি বলেন, ‘আমি রাউন্ডে ছিলাম, এর জন্য রুমে আসতে দেরি হয়েছে। আমার আউটডোর আছে আজকে।’ অথচ সাড়ে নয়টার পরে সেখানে আসেন ডা. পলাশ চন্দ্র সূত্রধর। তিনি আসার পরে চলে যান ডা. কাবেরী দাস। ডা. পলাশ জানান, আউটডোরের দায়িত্বে তিনিই আছেন।
৯টা ৪৫ মিনিটে আসেন ল্যাব টেকনোলজিস্ট শ্যামাপ্রসাদ সরকার। ৯টা ৫৩ মিনিটে আসেন গাইনি কনসালটেন্ট ডা. মুর্শিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘গ্রামের মানুষ ১০টার আগে আসে না। হঠাৎ দুই একজন আগে আসে। আর আমাদের নার্সরা থাকে। আমার জ্বর। আজ ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে।’
সকাল ১১টা পর্যন্ত আসেননি ইউনানী মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মোকছেদ আলী এবং ডেন্টাল সার্জন ডা. তারেকুজ্জামান। মুঠোফোনে ডা. তারেকুজ্জামান বলেন, ‘শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় আজ আমি যাইনি। কালকে যাব।’ অপরদিকে ডা. মো. মোকছেদ আলী বলেন, ‘আমি আজ ছুটি নিয়েছি।’
ডাক্তার দেখাতে আসা সালেহা বেগম বলেন, ‘টিকিট কেটে বসে আছি। ডাক্তার এখনো আসেনি। আসব একটু পরে। তাই বসে আছি।’
সট্টি থেকে আসা আয়েশা বেগম বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে এসে বসে আছি। কেউ এখনো আসেনি। হাসপাতালে ডাক্তাররা ঠিকমতো আসেন না। সকালে এসে অপেক্ষা করতে হয়। এতে ভোগান্তি হয় মানুষের।’
এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কাজী এ কে এম রাসেল বলেন, ‘আজকে যারা দেরি করে এসেছেন তাদের সবাইকে শোকজ করা হবে। পোশাকের বিষয়ে মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হবে। অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার প্রজেক্টটি শেষ হওয়ার কারণে ইউনানী মেডিকেল অফিসার কয়েকদিন ধরে অনুপস্থিত আছেন। যেহেতু তাকে সরকার থেকে এখনো অব্যাহতি দেওয়া হয়নি তাই তার অনুপস্থিতির ব্যাপারে কারণ দর্শানো হবে। ডেন্টিস্ট সার্জন সকালে জানিয়েছেন তিনি অসুস্থ।’
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোহিনুর আক্তার বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি জানা নেই। তদন্ত করে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মানিকগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. মো. মকছেদুল মোমিন বলেন, ‘আউটডোর সেবার সময় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। অফিস সময় দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- আফ্রিদি আহাম্মেদ/এমজে