Logo

সারাদেশ

গারো পাহাড়ে বেআইনি বিদ্যুৎ সংযোগের অভিযোগ, হুমকিতে বন্যপ্রাণী

Icon

ঝিনাইগাতী (শেরপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩১

গারো পাহাড়ে বেআইনি বিদ্যুৎ সংযোগের অভিযোগ, হুমকিতে বন্যপ্রাণী

আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালাকে উপেক্ষা করে শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় বেআইনিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি অসাধু চক্র বনভূমির ভেতরে এসব সংযোগ দিচ্ছে। এতে বৈদ্যুতিক লাইনে জড়িয়ে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী প্রাণ হারাচ্ছে। বৈদ্যুতিক শক দিয়ে ২০টিরও বেশি হাতি হত্যার অভিযোগও রয়েছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, বেআইনি বিদ্যুৎ সংযোগ ও বনভূমি দখল বন্ধ না হলে গারো পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য আরও মারাত্মক সংকটে পড়বে। তাদের দাবি, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে এলাকাটিকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা প্রয়োজন।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের শেরপুর বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ১৯ হাজার ২৭৫ একর বনভূমির মধ্যে দুই হাজার ৩৭ একর বনভূমি বর্তমানে বেদখলে রয়েছে। সূত্রমতে, বেদখল হওয়া এসব জমিতেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে গারো পাহাড় এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, একসময় যেখানে উঁচু-নিচু টিলা আর ঘন অরণ্য ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে বসতঘর ও বিদ্যুতের খুঁটি। সন্ধ্যার পর পাহাড়জুড়ে জ্বলে ওঠে বৈদ্যুতিক আলো। এতে করে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক আবাস ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ধীরে ধীরে বনভূমি রূপ নিচ্ছে বসতিপূর্ণ উপশহরে।

ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের গুরুচরণ দুধনই গ্রামের বাসিন্দা সঞ্চয় মারাক বলেন, ‘ছোটবেলায় পাহাড়ে বাঘডাশ, বানর, হরিণ, বন্য শূকর, কাঠবিড়ালি, বনমোরগসহ নানা পশু-পাখি দেখা যেত। এখন পাহাড় প্রায় উজাড়। একের পর এক বাড়িঘর উঠেছে, পল্লী বিদ্যুতের সংযোগে পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে গেছে। গহিন বন বলতে আর কিছুই নেই, তাই বন্যপ্রাণীরাও হারিয়ে গেছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, বন বিভাগের জমিতে দলিল-দস্তাবেজ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও বাস্তবে অতিরিক্ত টাকা দিলেই সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একটি সিন্ডিকেট চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে এক থেকে দু’দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে দিচ্ছে। এভাবে সংযোগ দেওয়ার প্রবণতা এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

সেভ দ্য ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড ন্যাচার (সোয়ান)-এর শেরপুর জেলার যুগ্ম সদস্যসচিব সানজিদা জেরিন বলেন, ‘বনের জমিতে বসতঘর নির্মাণ যেমন বেআইনি, তেমনি সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুতর অপরাধ। জমির কাগজপত্র যাচাই না করে সংযোগ দেওয়ার ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাস মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। বিদ্যুৎ শক দিয়ে হাতি হত্যার ঘটনায় মামলাও হয়েছে এবং অভিযুক্তরা সাজা ভোগ করেছে।’

বাংলাদেশ অ্যানিমাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আদনান আযাদ বলেন, ‘দুই দশক আগেও গারো পাহাড় ছিল গভীর বনাঞ্চল। বন দখলের কারণে বন্যপ্রাণীর আবাস সংকুচিত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বন্যপ্রাণী হত্যা। বিশেষ করে হাতি হত্যার দায় থেকে বিদ্যুৎ বিভাগ দায় এড়াতে পারে না।’

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘বালিজুড়ি এলাকায় বন্যহাতি মৃত্যুর ঘটনাস্থল তিনি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগের কারণেই অধিকাংশ হাতি মারা গেছে। বনে বিদ্যুৎ সংযোগ জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি শেরপুরের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মাইনউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বন বিভাগ চাইলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কাগজপত্র যাচাই না করে সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।’

শান্ত শিফাত/এনএ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর