Logo

সারাদেশ

ফুলবাড়ীর হিমাগারে আলু সংরক্ষণে জায়গা নেই, বিপাকে কৃষক

Icon

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২৫

ফুলবাড়ীর হিমাগারে আলু সংরক্ষণে  জায়গা নেই, বিপাকে কৃষক
দিনাজপুরের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাঁচ উপজেলার একমাত্র হিমাগার ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণের জায়গা না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও হাকিমপুর উপজেলার আলু চাষিরা। আলু সংরক্ষণ করতে না পারলে আগামী বছরে আলু চাষে বিরূপ প্রভাব পড়বে এমনটাই আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

হাকিমপুর উপজেলার খট্টামাধবপুর ডাঙাপাড়া গ্রামের আলু চাষি মমিনুল ইসলাম এ বছর তিন বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছেন। একটি ট্রাক্টরে করে ১৯ বস্তা আলু নিয়ে তিনি ফুলবাড়ী কোল্ডস্টোরেজে এসে জানতে পারেন স্টোরেজে আর আলু রাখার জায়গা নেই, ইতোমধ্যে জায়গা পূরণ হয়ে গেছে। স্টোরেজে জায়গা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে, এতে করে একদিকে সময় অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে গুণতে হচ্ছে বাড়তি গাড়ির ভাড়া। এবার আলুর বাম্পার ফলন হলেও দাম কম। ফলে পরবর্তী সময়ে ভালো দাম পেতে সবাই এখন হিমাগারে আলু রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

কৃষক মোমিনুল ইসলাম মতো এমন ভোগান্তিতে পড়েছেন একই এলাকার কৃষক এরশাদ আলী, ডাঙ্গাপাড়া এলাকার জাকিরুল ইসলাম, কবির হোসেন, পার্বতীপুরের ভবানীপুর এলাকার নূরুন্নবীসহ অন্তত শতাধিক আলু চাষি।

সরেজমিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কোল্ডস্টোরেজে গিয়ে দেখা যায়, স্টোরেজের ভেতরে অন্তত শতাধিক ট্রাক্টর, ভটভটি ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানভর্তি আলু নিয়ে হিমাগারে ঢোকানোর জন্য এসেছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা। কিন্তু স্টোরেজে এসে জায়গার অভাবে চোখেমুখে হতাশার ছাপ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে বাড়ীতে।

কৃষকদের অভিযোগ, হিমাগারে আলুভর্তি করতে কৃষকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের বেশি প্রাধান্য গিয়ে থাকেন হিমাগার কর্তৃপক্ষ। ফলে কৃষকের আলু আসার আগেই ব্যবসায়ী ও ফরিয়াদের আলুতে জায়গা পূরণ হয়ে যায় হিমাগার। এতে করে প্রকৃত আলু চাষিরা তাদের উৎপাদিত আলু রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না। কৃষকরা আলু সংরক্ষণের সুযোগ না পেলে আগামীতে বীজ আলুর সংকট দেখা দিবে এবং আলু চাষে বিরুপ প্রভাব পরবে।

নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জ এলাকার নারী কৃষক বিজলী রানী আগামী বছরে আবাদের জন্য বীজ হিসেবে ৫৫ কেজি ওজনের তিন বস্তা আলু আগেভাগে এনে হিমাগারে রেখেছেন। এখন আনলে জায়গার অভাবে রাখতে পারবেন না।

উপজেলার পাকাপান গ্রামের কৃষক শাহাজাহান আলী বলেন, চার বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছেন। ৫৫ কেজি ওজনের ২০ বস্তা আলু বীজ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য মনস্থির করেছেন। এজন্য হিমাগারের অবস্থা দেখতে এসে জানতে পারলেন হিমাগারে আলু রাখার মতো আর কোনো জায়গা নেই। আবাদের আলু এখন বিক্রি করে দিয়ে আগামীতে আলুর বীজ কিনেই আবাদ করবেন এমনটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

হাকিমপুর উপজেলার লোহাচড়া ডাঙ্গাপাড়া এলাকার কৃষক নূরুন্নবী বলেন, যে পরিমাণ জমিতে আলু আবাদ করেছেন তার বেশির ভাগ আলু হাটবাজারে বিক্রি করে উৎপাদন খরচ মিটিয়েছেন। শুনেছেন এবার হিমাগারে জায়গা নেই, তারপরও এলাকার কয়েকজন কৃষক দুই ট্রাক্টরে ৮০ বস্তা (৫৫ কেজি ওজনের) আলু নিয়ে এসেছেন ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে। গাড়ী ভাড়া দ্বিগুণ পড়েছে, তারপরও লাভের আশায় আলু রাখতে চান। কারণ এখন বাজারে আলুর দাম নিতান্তই কম। কিন্তু হিমাগারে জায়গার অভাবে ফেরত নিতে হচ্ছে আলু। এতে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ গুণতে হবে।

ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দিয়ে হিমাগারে আলু ঢোকানো হচ্ছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের প্রধান হিসাব রক্ষক আবুল হাসান বলেন, কৃষকদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অগ্রাধিকার দিয়েই আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা এক লাখ ৬০ হাজার বস্তা (প্রতি বস্তা ৬০ কেজি ওজন)। ইতোমধ্যে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ১১ হাজার বস্তা বেশী নিয়ে এক লাখ ৭১ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। জায়গার অভাবে উপায় না পেয়ে কৃষকদের ফেরত দিতে হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুলাহ্ মোস্তাকিন বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। এরজন্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন।  আগামীর আলু আবাদের জন্য বীজ সংরক্ষণ করা জরুরি। এজন্য হিমাগারগুলোকে অবশ্যই কৃষকদের আলু বীজ সংরক্ষণের বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান বলেন, আলুর দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের পাশাপাশি আলু সংরক্ষণের দিকে ঝুঁকেছেন ব্যবসায়ীরাও। এতে করে প্রত্যেকটি হিমাগারের ওপর চাপ বেড়েছে। আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আলুর আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।

বিকে/মান্নান
Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন